ম্যাচ চলতে চলতেই ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি প্রশ্ন করছিলেন, এর চেয়ে একপেশে ফাইনাল কি কখনো দেখেছে বিশ্বকাপ ফুটবল? আর্জেন্টিনার সমর্থকেরাও বোধ হয় ড্রুরির এই প্রশ্নের জবাবে ‘না’ বলতে পারবেন না আজ। পুরো ১২০ মিনিটেও গোলমুখে একটিও শট নিতে না পারা লিওনেল মেসির দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরলো স্পেন।
ম্যাচের একমাত্র গোলটি এসেছে ১০৬ মিনিটে বার্সেলোনা তারকা ফেরান তোরেসের পা থেকে। এর আগে স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী গোলটিও এসেছিলো আরেক বার্সা তারকা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পা থেকেই।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, পুরো ম্যাচে স্পেনের ১১টি ‘অন টার্গেট’ শটের বিপরীতে একটি শটও অন টার্গেটে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। রীতিমতো প্রথম মিনিট থেকেই নিজেদের খোলসে বন্দী করে রাখা স্কালোনির দল এক মুহূর্তের জন্যও স্প্যানিশ রক্ষণভাগে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেনি। উল্টো সহজ কিছু সুযোগ হাতছাড়া না করলে ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বাধা হয়ে না দাঁড়ালে জয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত স্পেনের।
পুরো টুর্নামেন্টে আক্রমণভাগে যে ধার দেখা গেছে আর্জেন্টিনার, ফাইনালে তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না। একে তো স্পেন নিজেদের পা থেকে বল ছেড়েছে খুব কম, তার উপর আর্জেন্টিনা যতবার বল পেয়েছে, সাইড পাস আর ব্যাক পাসেই তাদের বেশি মনোযোগী মনে হয়েছে। গোল করার কোন তাড়নাই দেখা যায়নি ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে চোট নিয়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ উঠে গেলে আরও গুটিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা।
আর্জেন্টিনাকে খোলসবন্দী দেখে দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণে উঠতে শুরু করে স্পেন। বেশ কয়েকবার গোলে শট নিয়েছেন লামিন ইয়ামাল-দানি ওলমোরা, কিন্তু প্রতিবারই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তবে আর্জেন্টিনার পেরেকে শেষ কফিন হয়ে এসেছে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড। দশ মিনিটের ব্যবধানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দুইটি হলুদ কার্ড দেখে দলকে আরও বিপদে ঠেলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন এনজো। আর্জেন্টিনা তখন প্রাণপনে চেষ্টা করেছে ম্যাচ কোনোরকমে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার।
আকাশি-সাদাদের সেই পরিকল্পনা প্রায় ভেস্তে দিয়েছিলেন ইয়ামাল। ইনজুরি টাইমের একদম শেষ সময়ে তার দারুণ ফ্রি-কিক মার্টিনেজ তার স্বভাবসুলভ ক্ষিপ্রতায় ঠেকিয়ে দিলে আরও একটি লাইফলাইন পায় স্কালোনির দল।
অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজকে তুলে মার্কোস সেনেসিকে নামানোর পর স্কালোনির ট্যাকটিকস আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, কোনো রকমে খেলা টাইব্রেকার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। নিশ্চিত দুটি গোলের সুযোগ মিস করে আর্জেন্টিনার সেই স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছিলেন নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল মেরিনো। ৯৩ মিনিটে স্রেফ ঠিকমতো মাথা ছোঁয়াতে পারলেই গোল পেতেন নিকো উইলিয়ামস, কিন্তু তিনি পারেননি। ১০৩ মিনিটে আরও সহজ সুযোগ মিস করেছেন বদলি খেলোয়াড় মেরিনো, একদম ফাঁকায় দাঁড়িয়েও নিকোর ক্রস থেকে হেড করে বল জালে ঢোকাতে পারেননি। মাঝে ৯৬ মিনিটে একবার স্পেনকে গোলের আনন্দে মাতিয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস, কিন্তু ফাউলের কারণে গোল বাতিল হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত যে এতগুলো গোল মিসের আক্ষেপে পুড়তে হয়নি স্পেনকে, সেটি ফেরান তোরেসের কল্যাণে। অতিরিক্ত সময়ের বিরতি থেকে ফিরে এক মিনিটের মধ্যেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী গোলের দেখা পেয়ে যায় স্পেন। পেদ্রো পোরোর ক্রস দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পেছন দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস। কিছুটা দৌঁড়ে এসে বাঁ পায়ের জোরালো শটে অবশেষে মার্টিনেজকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন ফেরান।
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে তখনো হয়তো ক্ষীণ আশা ছিল গোল শোধ দেয়ার। প্রতিটি নকআউট ম্যাচে এভাবেই তো ম্যাচে ফিরেছে তারা। কিন্তু আজ আর সেটি হওয়ার উপায় ছিল না। ম্যাচের একদম অন্তিম সময়ে সুযোগ পেয়েছিলেন বটে সিমিওনে, কিন্তু সেটি পোস্টের উপর দিয়ে উড়িয়ে মারায় জয় নিশ্চিত হয় স্পেনের।
এই জয়ের মাধ্যমে অনন্য একটি রেকর্ডও হয়েছে স্পেনের। ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে পুরুষ ও নারী দুই বিশ্বকাপেই একসাথে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির এখন স্প্যানিশদের। ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার শিরোপা জিতেছিলো স্পেনের নারী ফুটবল দল।

