নাথান লায়নের বলে বাংলাদেশের এগারো নম্বর ব্যাটার ইবাদত হোসেন উড়ালেন ছক্কা। এটা দেখে ধারাভাষ্যে থাকা অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বলে উঠলেন, ‘এই অস্ট্রেলিয়ানদের ভেতর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই।’ খানিক পর ইবাদতের বিদায়ে বাংলাদেশ থামলেও পুরো ইনিংস জুড়ে অজি বোলারদের হতাশা, ফিল্ডারদের ক্যাচ ফসকে যাওয়া আর দুর্বল শরীরী ভাষা দেশটির সাবেক ক্রিকেটারদের নজর এড়ায়নি। অ্যালিসা হিলি বলে উঠেন, ‘এটি অস্ট্রেলিয়াসুলভ নয়।’
ডারউইন টেস্টের প্রথম দুই দিন স্পষ্ট দাপট দেখায় বাংলাদেশ। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনেও টেইল-এন্ডাররা যে লড়াই চালাতে থাকেন তাতে নেতিয়ে পড়তে দেখা যায় পরাশক্তি অজিদের। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে থামা বাংলাদেশ নিয়ে নিয়েছে ২২৮ রানের লিড।
আগের দিনের ৬ উইকেটে ৩৫১ নিয়ে নেমে হাসান মাহমুদ ফিরে গিয়েছিলেন দ্রুত। তবে মেহেদী হাসান মিরাজ টেইল-এন্ডারদের নিয়ে চালাতে থাকেন লড়াই। প্রথমে তাইজুল ইসলামকে নিয়ে ছোট্ট প্রতিরোধের পর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে পার করে দেন প্রথম সেশন। এই সময়ে বাংলাদেশকে গুটিয়ে দিতে না পারার হতাশা গ্রাস করে স্বাগতিক দলকে।
হতাশায় সহজ ভুলও করে বসে তারা। প্যাট কামিন্সের বাউন্সারের ফাঁদে ফেলে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই সফরকারীদের ইনিংস গুটিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু স্টিভ স্মিথ অবিশ্বাস্যভাবে সীমানার কাছে এক সহজ ক্যাচ হাতছাড়া করেন।
ক্যাচটি তালুবন্দি করতে পারলে টেস্ট ক্রিকেটে এককভাবে সর্বকালের সর্বোচ্চ ক্যাচ সংগ্রাহক হয়ে যেতেন স্মিথ। ২১৮টি ক্যাচ নিয়ে তিনি এখন জো রুটের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে।
কায়ো স্পোর্টসে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বলছিলেন, ‘আর কারও ক্ষেত্রে বিশ্বাস হলেও স্টিভ স্মিথের হাত থেকে এমন ক্যাচ পড়ে যাওয়া অবিশ্বাস্য! আজ এক বিশ্বরেকর্ড গড়া থেকে বঞ্চিত হলেন তিনি।’
একই ওভারে পেছনের দিকে দৌড়ে আরও একটি কঠিন ক্যাচ ছাড়েন ট্র্যাভিস হেড। ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ ফাইনালে রোহিত শর্মাকে যেভাবে অসাধারণ এক ক্যাচে ফিরিয়েছিলেন, ঘটনাটি যেন হুবহু তারই পুনরাবৃত্তি—শুধু ফলটা এলো বিপরীত! ইনিংসে সেটি ছিল স্বাগতিকদের পঞ্চম ক্যাচ মিস। ফিল্ডিংয়ের জন্য সুনাম থাকা অজিদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিই বটে।
কায়ো স্পোর্টসে কথাটি তুলে ধরে অ্যালিসা হিলি মন্তব্য করেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডিংয়ের যে ঐতিহ্য, তার সঙ্গে এটি মোটেও মেলাতে পারা যায় না, তাই না?’
টানা ১৩৮ ওভার বোলিং করার পর অজি বোলাররা যে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা চোখে ধরা পড়ে সাবেকদের।
ওভারের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের দীর্ঘতম ইনিংস। তবে ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অজিদের বিপক্ষে তোলা সর্বোচ্চ ৪২৭ রানের সংগ্রহটি স্পর্শ করতে মাত্র ১ রান দূরে থামতে হয় টাইগারদের।
অস্ট্রেলিয়ানদের হতাশা তুলে ধরবে আরেক পরিসংখ্যান। গত দুই বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে এত দীর্ঘ সময় মাঠে ফিল্ডিং করতে হয়নি। সবশেষ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির প্রথম টেস্টে পার্থে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩৪.৩ ওভার বোলিং করেছিল তারা, এবার সেই রেকর্ডও ছাপিয়ে গেল।
এই টেস্টে মহাকাব্যিক জয় পেতে হলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হবে।
ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০০-র বেশি রানে পিছিয়ে পড়ে অজিরা এর আগে সাকুল্যে একটি টেস্টেই জিততে পেরেছিল। ২০১০ সালে সিডনি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০৬ রানে পিছিয়ে পড়েও মাইকেল হাসির শতক আর নাথান হাউরিটজের ৫ উইকেটে ভর করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ব্যাগি গ্রিনরা।
ফক্স ক্রিকেটের ‘দ্য বিগ ব্রেক’ অনুষ্ঠানে ডেভিড ওয়ার্নার বলেন, ‘ম্যাচে ফিরতে হলে অস্ট্রেলিয়াকে অন্তত ৫০০ থেকে ৫৫০ রান তুলতে হবে। প্রতিপক্ষকে অলআউট করার জন্য ২০০ রানের লিড কোনো কাজেই আসবে না।’
আজকের দিনের খেলা শেষে সর্বোচ্চ কয়টি উইকেট পড়লে দল নিরাপদ থাকবে—ব্রেন্ডন জুলিয়ানের এমন প্রশ্নে ওয়ার্নারের স্পষ্ট জবাব, ‘চারের বেশি কোনোভাবেই নয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশের আসল লক্ষ্য এখন স্টিভ স্মিথ আর ট্র্যাভিস হেড। এই দুজনকে দ্রুত ফেরাতে পারলেই ব্যাকফুটে চলে যাবে অস্ট্রেলিয়া।’

