ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। গতকাল বুধবার পেন্টাগনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। এটি এই সংঘাতের সামরিক ব্যয়ের প্রথম সরকারি হিসাব। রয়টার্সের খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হাতে আছে মাত্র ছয় মাস। হাউসে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা নিয়ে রিপাবলিকানরা যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন জনমতে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তারা কৌশলে ইরান যুদ্ধের বিপুল খরচকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে জনসমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বর্তমানে কম্পট্রোলারের দায়িত্ব সামলানো জুলস হার্স্ট উল্লেখ করেন, এই খরচের বেশিরভাগই ছিল গোলাবারুদের জন্য।
এই ব্যয়ের প্রাক্কলনে ঠিক কী অন্তর্ভুক্ত আছে, হার্স্ট সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটির অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের সম্ভাব্য খরচ এই হিসাবে ধরা হয়েছে কি না, তাও তিনি স্পষ্ট করেননি।
হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ হার্স্টের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি খুশি যে আপনি প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছেন। কারণ আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এই তথ্যটি জানতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু এতদিন কেউ আমাদের সঠিক তথ্য দেয়নি।
যুদ্ধে এ পর্যন্ত খরচ হওয়া এই ২৫ বিলিয়ন ডলার নাসার চলতি বছরের বাজেটের সমান। তবে পেন্টাগন কীভাবে এই হিসাব করল, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কারণ গত মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একটি সূত্র জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সেই লক্ষ্য অর্জনে এই ব্যয় সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
হেগসেথ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ইরানের হাতে যেন পারমাণবিক বোমা না যায়, তা নিশ্চিত করতে আপনারা কতটুকু মূল্য দিতে রাজি আছেন? কত ব্যয় করবেন আপনারা?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে হেগসেথ এক উত্তপ্ত ভাষণ দেন। তিনি এই যুদ্ধকে চোরাবালি মানতে নারাজ। উল্টো এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিরোধী ডেমোক্র্যাট সদস্যদের অযোগ্য ও অদক্ষ বলে আক্রমণ করেন তিনি।
ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্যারামেন্ডির বক্তব্যের জবাবে হেগসেথ বলেন, আপনি একে চোরাবালি বলছেন? এভাবে শত্রুদের হাতে প্রচারণার অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন? আপনার এই বক্তব্যের জন্য লজ্জা হওয়া উচিত।
একইসঙ্গে তিনি কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের বেপরোয়া, অকর্মণ্য এবং পরাজয়বাদী বলে কঠোর সমালোচনা করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে এবং বর্তমানে উভয়পক্ষ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে এবং ওই অঞ্চলে বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রেখেছে।
ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সৈন্য নিহত এবং কয়েকশ সেনা আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু খুব কমই আছে। বর্তমানের ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরীণ মহলে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। নভেম্বরের নির্বাচনে হাউস ও সেনেটে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, মূল্যস্ফীতি তা আরও উসকে দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া উচ্চ বাজারদরের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে সারসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য, যা সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম গত প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৪ শতাংশ আমেরিকান ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা এপ্রিলের মাঝামাঝি ছিল ৩৬ শতাংশ এবং মার্চের মাঝামাঝি ছিল ৩৮ শতাংশ।

