ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সম্ভাব্য বৈঠকে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো নিয়ে ওয়াশিংটন আশাবাদী হলেও কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান।

বুধবার মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া বার্তার বিপরীতে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ না তুললে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ অচল করে দেওয়া হবে। এএফপির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহেই পুনরায় আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনের নতুন এক বার্তা নিয়ে তেহরানে পৌঁছেছে একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পরবর্তী আলোচনা সম্ভবত পাকিস্তানের রাজধানীতেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চুক্তির সম্ভাবনার বিষয়ে আমরা ইতিবাচক মনোভাব রাখছি।’

প্রথম দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশকের পুরনো বিরোধ মেটাতে ইরানকে একটি ‘বড় সমঝোতার’ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ‘অভিন্ন’। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরান থেকে সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়া, দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অভিযান শুরুর পর থেকে ইরান এই পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছে। এই প্রণালি নিয়ে দ্বন্দ্বে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অমীমাংসিত থাকলে এবং তেলের দাম চড়া থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘কঠিন সময়ের’ মুখোমুখি হতে হবে; এমনকি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি খাদ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে ওয়াশিংটন-তেহরান দ্বন্দ্বে সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে বুধবার ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ার বাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে, ফলে প্রধান সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে।

ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের মাধ্যমে দেশটির ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে যে, তারা সমুদ্রপথে ইরানের ভেতরে ও বাইরে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ‘পুরোপুরি বন্ধ’ করে দিয়েছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, অবরোধের প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ইরান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চালানো ১০টি জাহাজকে তারা ফিরিয়ে দিয়েছে এবং ‘একটি জাহাজও এই অবরোধ ভেঙে বের হতে পারেনি।’

তবে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি ততটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে।

ইরানের সামরিক সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারের প্রধান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অবরোধ তুলে না নেয়, তবে তা হবে ৮ এপ্রিল হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ‘সূচনা’।

আলি আবদুল্লাহি বলেন, ওয়াশিংটন নমনীয় না হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগরে কোনো ধরনের আমদানি বা রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রম চলতে দেবে না।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ‘তদারকি’ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেবে ইরান।

গত মাসে খামেনির সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হওয়া ইরানের রক্ষীবাহিনীর সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়ি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, তাদের জাহাজগুলো আমাদের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রেই ডুবে যাবে।

বুধবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে আসা একটি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়েছেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, এই দলটি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নতুন একটি বার্তা পৌঁছে দিতে এবং দ্বিতীয় দফার আলোচনা নিয়ে কথা বলতে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, যেকোনো চুক্তিতে ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময়ে তার দাবি ছিল, তেহরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ শেষ করছে। তবে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা এই দাবির সপক্ষে কিছু জানায়নি।

জানা গেছে, ওয়াশিংটন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানালেও তেহরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে, যা মার্কিন কর্মকর্তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তেহরান জোর দিয়ে বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য বেসামরিক ব্যবহার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার জানায়, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার ‘তর্কের ঊর্ধ্বে’, যদিও সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নিয়ে ‘আলোচনা হতে পারে’।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার এই সবশেষ ইঙ্গিতটি এমন সময়ে এলো, যখন ১৯৯৩ সালের পর মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠকের পর ইসরায়েল ও লেবানন সরাসরি আলোচনা শুরুর বিষয়ে একমত হয়েছে।

বুধবার নেতানিয়াহু লেবাননের সঙ্গে আলোচনার দুটি প্রধান লক্ষ্যের কথা জানান— প্রথমত, হিজবুল্লাহকে নির্মূল করা; দ্বিতীয়ত, শক্তির দাপটে টেকসই শান্তি ফিরিয়ে আনা।

ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল ও লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাপ দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এটি বৃহত্তর সমাধান প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বুধবার জানান, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ট্রাম্প হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের অবসানের বিষয়টি ‘স্বাগত’ জানাবেন, তবে এই চুক্তি ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অংশ নয়।

তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতা এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। আলোচনার ঘোর বিরোধী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে কয়েক ডজন রকেট ছুড়েছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় লেবাননে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করেছে।

Related Articles

Latest Posts