দলিত-তফসিলি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমানের অভিন্ন স্বার্থ এবং উপমহাদেশের রাজনীতিতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইতিহাসে যথাযথভাবে উঠে আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ।
তার মতে, রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ইতিহাসে নিম্নবর্গের মানুষের অবদানকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হয়েছে।
আজ শনিবার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘ফিরে দেখা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল’ শীর্ষক দ্য ডেইলি স্টার ইতিহাস আড্ডার ৩১তম পর্বে তিনি এ কথা বলেন।
আলতাফ পারভেজ বলেন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও শিডিউলড কাস্টের ব্যাপারে আমরা এত বছর পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছি।
তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালে জাতীয় সংসদে শিডিউলড কাস্টের ৩৭ জন প্রতিনিধি থাকলেও এবার বাংলাদেশে এই সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধি নেই।
বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র সাধনায় শিডিউলড কাস্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিহাসে এর কোনো যথাযথ উল্লেখ নেই।
যোগেন্দ্রনাথের অন্যতম বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে তিনি ড. বি আর আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাতে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
যোগেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শন প্রসঙ্গে আলতাফ বলেন, শূদ্রের স্বাভাবিক আত্মীয়তা মুসলমানের সঙ্গে। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে নয়।
তার মতে, নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলমানের অভিন্ন স্বার্থ থেকেই এ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্ম। তবে ১৯৪৭ সালে ঐক্য ও শান্তির বদলে দাঙ্গা ও খুনাখুনি জয়ী হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিভেদ থেকে সমাজের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আলতাফ বলেন, নতুন সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রস্তুতি ছাড়া যোগেন্দ্রনাথকে স্মরণ করার বিশেষ অর্থ নেই।
অধ্যাপক মুনিরা সুলতানা বলেন, যোগেন্দ্রনাথকে শুধু দলিত নেতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক দর্শনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। তফসিলি জাতির সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সংখ্যালঘু অধিকার ছিল তার চিন্তার কেন্দ্রে।
তিনি বলেন, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের অভিন্ন শ্রেণিগত বাস্তবতা থেকেই যোগেন্দ্রনাথ রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। নিজের ‘শূদ্র’ পরিচয়কেও তিনি রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভিত্তি করেছিলেন।
যোগেন্দ্রনাথের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মুনিরা বলেন, শূদ্র হয়ে জন্মাতে হয়। একমাত্র তাহলেই পাওয়া যায় শূদ্রের এই স্বাধীনতা। আমি স্বাধীন শূদ্র।
দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথের স্বদেশ অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত স্বদেশহীনতার যাত্রায় পরিণত হয় উল্লেখ করে মুনিরা বলেন, বিভাজিত দেশে বিতাড়িত অস্পৃশ্য যোগেন স্বদেশকে হারিয়ে ফেললেন।
তার মতে, যোগেন্দ্রনাথের জীবন ‘ইতিহাস এবং সময়ের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ।’
লেখক ও গবেষক হরিদাস ঠাকুর বলেন, যোগেন্দ্রনাথ শুধু নমঃশূদ্রদের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সব অধিকারহারা ও শ্রমজীবী মানুষের নেতা। তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি ‘বহুজনবাদী সমাজ’, যেখানে জন্মগত পরিচয়ের কারণে কেউ শোষিত বা বঞ্চিত হবে না।
নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের অভিন্ন স্বার্থই মুসলমানদের সঙ্গে যোগেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক জোটের অন্যতম ভিত্তি ছিল বলে উল্লেখ করেন হরিদাস।
বলেন, ১৯৪৬ সালে গণপরিষদে নির্বাচিত হয়ে আম্বেদকরকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
হরিদাস জানান, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় উর্দুকে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব উঠলে যোগেন্দ্রনাথ এর বিরোধিতা করে বাংলাকে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম করার পক্ষে অবস্থান নেন। পরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মোহভঙ্গ হয়ে ১৯৫০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
মুসলিম লীগকে সমর্থন এবং দেশভাগের জন্য যোগেন্দ্রনাথকে দায়ী করার প্রবণতাকে ‘ইতিহাসের অজ্ঞতার’ ফল বলে মন্তব্য করেন হরিদাস। তার ভাষায়, ‘যোগেন মণ্ডলরা হারিয়ে যান না, তাদের চেতনাটা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক থাকবে।’
আড্ডায় সূচনা বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও গবেষক সামসুদ্দোজা সাজেন এবং সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ। শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

