আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একজোট পুরো লাতিন আমেরিকা!

লাতিন আমেরিকার ফুটবল ভক্তদের একটা চিরাচরিত নিয়ম আছে—বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিজেদের অঞ্চলের দলগুলো যখন একে একে বিদায় নেয়, তখন বাকি থাকা লাতিন পরাশক্তিদের পেছনে সবাই এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এবারের চিত্রটা একদম আলাদা। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভেসে বেড়ানো অজস্র মিম, কৌতুক আর আলোচনা একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম আর্জেন্টিনা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা এডিটেড ছবিতে দেখা যায়, ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল ব্রাজিলের জার্সি পরে আছেন। ছবির নিচে টিপ্পনি কেটে লেখা—’ব্রাজিলিয়ানদের শেষ ভরসা!’

উন্মাদনাটা এখন আর কেবল পেলের ব্রাজিল বনাম ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার চিরন্তন দ্বৈরথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলির মতো দেশগুলোর সমর্থকরাও মনেপ্রাণে চাচ্ছেন, রবিবার যেন লিওনেল মেসির আলবিসেলেস্তেরা হেরে যায়।

২০২২ সালে আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের আগেও ঠিক একই রকম দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।

কলম্বিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জার্মান গোমেজ এএফপি-কে বলেন, আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে লাতিন আমেরিকার সেই ‘আঞ্চলিক সংহতির দেয়াল’ ভেঙে গেছে। তার মতে, ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানুষের মনে এমন একটা ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, এই দলটি ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বড্ড প্রিয়পাত্র।

সাও পাওলোর একটা শপিং সেন্টারে বিশ্বকাপের স্টিকার বদল করার সময় ফ্রান্সিসকো সান্তোস নামের এক ব্রাজিলিয়ান সমর্থক সরাসরিই বললেন, ‘আর্জেন্টিনা রেফারিদের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পায়।’

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড যখন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম গোলটা দিল, তখন ওই শপিং সেন্টারে রীতিমতো উল্লাসের রোল উঠেছিল। ৪২ বছর বয়সী এই সমর্থক আরও যোগ করলেন, ‘ব্রাজিল যেহেতু ষষ্ঠবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হতে পারল না, তাই আর্জেন্টিনা চারবার ট্রফি নেওয়ার চেয়ে স্পেন দ্বিতীয়বার জিতুক, এটাই আমি বেশি চাই।’

সমালোচকদের দাবি—পেনাল্টি হোক কিংবা প্রতিপক্ষকে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানো, মাঠের রেফারিরা বারবার আর্জেন্টিনার পক্ষ নিয়েছেন। যদিও ফিফা সিদ্ধান্তগুলোকে সঠিক বলেই রায় দিয়েছে।

বোগোতার ২৮ বছর বয়সী ফাইন্যান্স কর্মী হুয়ান কামিলো আবুসাইদ যেমন পরিষ্কার বলে দিলেন, ‘আমরা এবার স্পেনের জন্যই গলা ফাটাব।’

মাঠের লড়াই বনাম পর্দার রাজনীতি

মেক্সিকো সিটির ৫১ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা আন্তোনিও লোপেজ অবশ্য মেসিকে একজন ‘কিংবদন্তি’ হিসেবেই মানেন। তবে তার মনেও ক্ষোভ আছে, ‘আপনি যদি মাঠে রক্ত জল করা পরিশ্রম করে চ্যাম্পিয়ন হন, তবে সেটাকে আমি স্যালুট জানাব। কিন্তু রেফারিরা যদি আপনাকে জেতাতে সাহায্য করে, তবে সেটা কোনোভাবেই মানা যায় না।’

এমনকি একটি সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম যখন রসিকতা করে সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করলেন, ফাইনালে তারা কাকে সমর্থন করছেন? তখন সবাই একযোগে চিৎকার করে উত্তর দিল, ‘স্পেন! স্পেন!’

খেলাধুলার সামাজিক দিক নিয়ে গবেষণা করা মেক্সিকান নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক হোর্হে নেগ্রোয়ের মতে, ‘এই বিশ্বকাপটি ভীষণভাবে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।’ সমাজবিজ্ঞানী গোমেজ অবশ্য এর একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দিলেন। তার মতে, ম্যারাডোনাকে যেখানে দেখা হতো ফিফার একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন বিপ্লবী হিসেবে, সেখানে বর্তমানের ফুটবল রাজনীতিতে মেসিকে বিবেচনা করা হয় ফিফার ‘আদরের ছেলে’ হিসেবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও। চিলির সান্তিয়াগোর বাসিন্দা, ২৯ বছর বয়সী রাশিদ শ্যোবার্গ স্পষ্টই বললেন, ‘আমি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে একদমই সহ্য করতে পারি না। আর্জেন্টিনা যদি জিতে যায় আর এরপর তিনি যেভাবে এই ট্রফি নিয়ে রাজনৈতিক বড়াই করবেন, সেই দৃশ্য দেখার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।’

বিতর্কের পালে হাওয়া দিয়েছে আর্জেন্টাইন সমর্থক ও কিছু খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ওঠা বর্ণবাদের অভিযোগও। অতীতে দলের খেলোয়াড়দের গাওয়া একটা বিতর্কিত গান নতুন করে সামনে এসেছে, যেখানে ফ্রান্স দলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের ফরাসি পরিচয় নিয়ে উপহাস করা হয়েছিল। এছাড়া ক্লাব ফুটবলেও ব্রাজিলিয়ান সমর্থক বা কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের দিকে কলা ছুড়ে মারা বা বানরের মতো অঙ্গভঙ্গি করার পুরনো ইতিহাস তো আছেই। এমনকি এই বিশ্বকাপ চলাকালেই এক লাইভস্ট্রিমে আর্জেন্টাইন সমর্থক কর্তৃক ‘আইশোস্পিড’  নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সারকে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় ফিফা এক কড়া বিবৃতিতে এর তীব্র নিন্দা জানায়।

আমরা এমনই অসহ্য’

মেসি নিজেও দলটির প্রতি চারপাশের এই তীব্র নেতিবাচক অনুভূতি সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই অবগত। সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে আমরা যা চেয়েছিলাম তা অর্জন করেছি: ফাইনালে খেলা এবং চার বছর সেরা হয়ে থাকা। আমরা আবারও প্রমাণ করেছি যে কেউ আমাদের কোনো কিছু বিনামূল্যে দিয়ে দেয় না। আমরা নিজেদের যোগ্যতায় আবারও সেরা দুটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছি। এতে যার কষ্ট লাগে, তার লাগুক।’

আর্জেন্টিনায় দারুণ জনপ্রিয় একটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় ‘ফার্নেট’-এর একটা ব্র্যান্ড আবার এই আর্জেন্টিনা-বিরোধী মনোভাবকে দারুণ রসবোধের সাথে বিজ্ঞাপনে কাজে লাগিয়েছে। ‘আমরা এমনই অসহ্য’—এই স্লোগান দিয়ে বানানো বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা একসাথে বসে আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের এই বাঁধভাঙা আর উগ্র আবেগ নিয়ে হাহুতাশ করছে।

পুরো লাতিন আমেরিকা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোমর বেঁধে নামলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দলটির অনুশীলন ক্যাম্পগুলোর ছবি কিন্তু ভিন্ন। সেখানে হাজার হাজার ভক্ত এখনো ‘মেসি! মেসি!’ চিৎকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছেন।

আর সবার মাঝে এখনো কিছু মানুষ আছেন যারা আঞ্চলিক ভালোবাসাকেই সবার উপরে রাখেন। লিমার ২০ বছর বয়সী ছাত্র ভ্যালেন্টিনো তোকতো যেমনটা বললেন, ‘দিনশেষে আমি আর্জেন্টিনাকেই সমর্থন করব, কারণ ওটা তো আমাদেরই দক্ষিণ আমেরিকার দেশ।’
 

Related Articles

Latest Posts