আরব সাগরে মিসাইল হামলার শিকার একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ৫ বাংলাদেশি নাবিককে উদ্ধারের পর পাকিস্তানের করাচিতে নেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার উদ্ধার হওয়া নাবিকদের মধ্যে ইঞ্জিন ক্যাডেট আহসান সাবরি রিহাদ দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জাহাজটির মালিকপক্ষ পাকিস্তানে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর জবাবের অপেক্ষায় আছে।
গত মঙ্গলবার সকালে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ঠিক আগেরদিন সাংহাই থেকে ওমানের সোহার বন্দরের পথে ছিল চীনা মালিকানাধীন পানামা পতাকাবাহী জাহাজ এমভি গোল্ড অটাম। সোহার বন্দর থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থানের সময় মিসাইল হামলার শিকার হয় জাহাজটি।
আহসান সাবরি রিহাদ জানান, জাহাজে থাকা মোট ২২ নাবিকের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৬ জন। হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে ক্যাপ্টেন জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। এ সময় ১ বাংলাদেশিসহ মোট ৪ নাবিক লাইফবোটে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টাকালে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়।
উত্তাল সাগরে দীর্ঘ সময় চরম ঝুঁকি নিয়ে ভেসে থাকার পর এমভি ইউনিস নামের একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।
পরদিন বুধবার দুপুরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন ক্ষতিগ্রস্ত গোল্ড অটাম জাহাজ থেকে ৪ বাংলাদেশিসহ ১৪ নাবিককে উদ্ধার করে। সেই সঙ্গে এমভি ইউনিস থেকে আরও ৪ জনকে নিয়ে করাচিতে পৌঁছে দেয়।
এখনো এক বাংলাদেশিসহ ৪ নাবিক ক্ষতিগ্রস্ত গোল্ড অটাম জাহাজটিতে অবস্থান করছেন। তারা জাহাজটিকে ওমানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন জানান, বাংলাদেশি নাবিকদের দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অনুমতি পেতে করাচির উপ-হাইকমিশনে ইমেইল করা হয়েছে। তবে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যান্য দেশের দূতাবাস ইতোমধ্যে তাদের নাবিকদের ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান শাখাওয়াত হোসেন।
নিজের প্রথম চাকরি হিসেবে গত জুনে গোল্ড অটাম জাহাজটিতে যোগ দেন কক্সবাজারের বাসিন্দা ২০ বছর বয়সী ইঞ্জিন ক্যাডেট রিহাদ। দ্য ডেইলি স্টারকে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
রিহাদ জানান, ‘সকাল ১১টার সময় আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি হয়। সোয়া ১১টার দিকে হঠাৎ একটি বড় বিস্ফোরণে জাহাজ কেঁপে ওঠে। ইঞ্জিন রুমে গিয়ে দেখি সব ঠিক আছে। তবে ডেকে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। তখনই বুঝতে পারি মিসাইল হামলা হয়েছে। সময়ক্ষেপণ না করে জাহাজের অ্যাকোমোডেশন রুমে গিয়ে আশ্রয় নেই আমরা। কিছুক্ষণ পর আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।’
জাহাজটির অ্যাবল-বডিড সিম্যান তাওহিদুর রহমান নূর বলেন, ‘আমি মাত্র কাজ শেষ করে খেতে বসেছি, তখনই বিস্ফোরণ হয়। ৪ নম্বর কার্গোর যে স্থানে আমরা কাজ করছিলাম, সেখানেই আগুন ধরে যায়।’
‘অল্পের জন্য বেঁচে গেছি,’ যোগ করেন নূর।
রিহাদ জানান, একের পর এক বিস্ফোরণে জাহাজের ইঞ্জিন, জেনারেটর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এরপর দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ক্যাপ্টেন জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। লাইফবোট নামাতে গিয়ে আগুন ও ধোঁয়ার কারণে তারা নানা সমস্যায় পড়েন। এক পর্যায়ে দড়ি ছিঁড়ে একটি লাইফবোট সাগরে ভেসে যায়।
তিন ইন্দোনেশীয় সহকর্মীর সঙ্গে আগুন জ্বলতে থাকা অংশের আরেকটি লাইফবোট নামানোর চেষ্টা করেন রিহাদ। সেটিও দড়ি ছিঁড়ে ছিটকে পড়লে সাগরে পড়ে যান রিহাদ।
‘কীভাবে আবার ভেসে উঠেছি জানি না। একজন ইন্দোনেশীয় সহকর্মী আমাকে টেনে তোলেন,’ বলেন রিহাদ।
লাইফবোটের ইঞ্জিনও কাজ না করায় তারা কয়েক ঘণ্টা ঢেউয়ের মধ্যে ভেসে থাকেন।
রিহাদ বলেন, ‘আমি বারবার বমি করেছি, খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল আর বাঁচব না।’
অবশেষে সন্ধ্যার দিকে এমভি ইউনিস জাহাজটিকে দেখতে পেয়ে ফ্লেয়ার ছোঁড়েন রিহাদরা। দড়ি দিয়ে টেনে তাদের উদ্ধার করে জাহাজটি।
পরে ওই জাহাজ থেকে স্যাটেলাইট ফোনে গোল্ড অটামের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মালিকপক্ষ যোগাযোগ করার পর বুধবার সকাল ৮টার দিকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির কাছে পৌঁছায়।
এরপর তাদের উদ্ধার করে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

