‘আমি সুস্থ, বাড়ি ফিরে যেতে চাই’

মাদারীপুরের তরুণ নির্মাণশ্রমিক সাব্বির হোসেন দীর্ঘ তিন মাস ধরে চিকিৎসাধীন পাবনা মানসিক হাসপাতালে। কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছুটি পান। কিন্তু বাড়ি ফেরার মাত্র একদিন পরই পরিবারের সহায়তায় তাকে আবারও পুরোনো ওয়ার্ডেই ভর্তি করা হয়েছে।

সাব্বির বাড়ি ফিরতে চান, কিন্তু পরিবার তাকে নিতে রাজি না। সম্প্রতি পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনে কথা হয় সাব্বিরের সঙ্গে। কেন তাকে পরিবার রাখতে চায় না জানালেন কারণ।

‘বাবার ওপর হামলা করার কারণে পরিবার আমাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন সাব্বির।

সাবলীলভাবে কথাটি বলার পর সাব্বির স্পষ্টভাবে জানান, ‘আমি সুস্থ, শুধু বাড়ি ফিরতে চাই।’

সাব্বিরের এই পরিণতি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। পটুয়াখালীর মো. তরুণ মিয়া ২৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার ঠিক পরের দিনই স্বজনদের মাধ্যমে আবার ভর্তি হন পাবনা মানসিক হাসপাতালে।

হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডের স্টাফ নার্স রাজিয়া বেগম ডেইলি স্টারকে জানান, হাসপাতাল থেকে রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিয়ে যখন অবস্থার উন্নতি হয়, তখন তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে রিলিজ দেওয়া হলেও, অনেক পরিবারই আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় না।

এ কারণে অনেকেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে আবার নতুন রোগী হিসেবে ভর্তি হন বলে জানান তিনি।

প্রায় সব ওয়ার্ডেই প্রতিনিয়ত এটি ঘটছে বলে জানান রাজিয়া। তার ওয়ার্ডের ২৫ জন রোগীর মধ্যে ৩ জনকে সম্প্রতি একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে নতুন করে ভর্তি হতে হয়েছে।

রাজিয়া বলেন, ‘অনেক পরিবারই মানসিক অসুস্থ স্বজনদের দায়িত্ব নিতে চান না। ছাড়পত্র পাওয়ার পর আত্মীয়রা বহির্বিভাগ দিয়ে আগের চিকিৎসার তথ্য লুকিয়ে নতুন রোগী হিসেবে ভর্তি করিয়ে দিয়ে যান।’

পাবনা মানসিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. এহিয়া কামাল জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আবাসিক রোগীদের ৩০ শতাংশের বেশি পুনর্ভর্তি হওয়া পুরোনো রোগী।

‘৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু বারবার একই রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমরা নতুন রোগীদের সেবা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করছি,’ বলেন ডা. এহিয়া।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে ৩৫ হাজার ৩৭০ রোগী সেবা নিয়েছেন। একইসময়ে ২ হাজার ৭২৩ জন ভর্তি হন এবং ২ হাজার ৭০৭ জন ছাড়পত্র পান।

তবে নিয়মিত পুনর্ভর্তির কারণে নতুন রোগীদের জন্য শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান তিনি।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আব্দুল বারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বেশিরভাগ রোগীর পরিবার চায় তাদের স্বজনরা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরুক।’

চিকিৎসকদের মতে, শুধু হাসপাতালের সেবা দিয়ে মানসিক রোগীর চিকিৎসা পরিপূর্ণ করা সম্ভব নয়।

তত্ত্বাবধায়ক এহিয়া কামাল বলেন, ‘মানসিক রোগ রাতারাতি ভালো হওয়া সম্ভব না। রোগীরা হাসপাতাল থেকে নিয়মিত চিকিৎসা ও পথ্য নেওয়ার পর অবস্থার উন্নতি হলে পরিবারের কাছে চিকিৎসাপত্র দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র মেনে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে এবং পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করলে ধীরে ধীরে রোগীরা ভালো হয়ে যেতে পারে বলে জানান তিনি।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘তবে বেশিরভাগ রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। ফলে নিয়ম মেনে চিকিৎসা না নেওয়ায় আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেক রোগী।’

মানসিক রোগীদের সেবার জন্য পরিবার ও সমাজকে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।

হাসপাতাল চত্বরে দেখা হয় পাবনার তিলকপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী এক মানসিক রোগীর সঙ্গে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা তার মেয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার বাবা আগে ব্যবসা করতেন। একটি দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকে পরিবারের সবাই তাকে অবহেলা করা শুরু করে।

ফলে বাধ্য হয়ে মেয়েই বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন।

চিকিৎসকরা জানান, মানসিক রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া শুরু করতে পারলে ভালো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে যাদের ক্ষেত্রে রোগটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেছে, তাদের জন্য পরিবার ও সমাজের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।

এদিকে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল হলেও, পাবনা মানসিক হাসপাতালে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। ৬৫০টি অনুমোদিত পদের ১৬১টিই বর্তমানে খালি, যার মধ্যে ১২টি চিকিৎসক পদ।

বর্তমানে মাত্র ১৯ জন চিকিৎসক এবং প্রায় ৪৩৭ জন কর্মী নিয়ে হাসপাতালটি চলছে। ৪০০ জনের বেশি আবাসিক রোগী ও প্রতিদিন ১১০০-১২০০ রোগীকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্বল্প জনবল নিয়ে প্রতিদিন এত বিপুল সংখ্যক রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে হাসপাতাল

ডা. এহিয়া কামাল বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে হাসপাতালের উন্নয়নে একটি মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, শয্যা সংখ্যাসহ সেবার পরিসর আরও বৃদ্ধি পাবে আশা করি।’

Related Articles

Latest Posts