আগামী কয়েক মাসেও তৈরি পোশাক রপ্তানির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে মন্দা কাটছে না। রপ্তানিকারক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মতে, আগামী কয়েক মাসেও এই খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটলেও পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে খুচরা বিক্রি কমে যাওয়া এবং বিক্রেতাদের কাছে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত পোশাকের মজুত থাকায় বিদেশি ক্রেতারা নতুন করে বড় অর্ডার দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানিকারক প্রধান দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পোশাক কেনার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, দেশে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন খরচও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সায়েম গ্রুপের পরিচালক আবরার এইচ সায়েম বলেন, আমরা এখন এক ধরনের ঝড়ের মধ্যে আছি। তাদের প্রতিষ্ঠান ইউএস পোলো অ্যাসন, ব্রিটিশ ব্র্যান্ড বেন শারম্যান এবং ইউরোপীয় ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ড নিউইয়র্কারের জন্য পোশাক সরবরাহ করে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

রপ্তানিকারকদের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ ছিল কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। যদিও শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ঘোষিত ১০ শতাংশ শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে সেই অনিশ্চয়তার একটি অংশ দূর করেছে, তবুও বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো দুর্বল।

হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এখনো কাটেনি। তাই নতুন অর্ডার দেওয়ার গতি খুবই ধীর।

তিনি বলেন, যুদ্ধ, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের হাতে আগের অবিক্রীত মজুত—সব মিলিয়ে নতুন অর্ডার দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

স্কয়ার অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, পশ্চিমা ক্রেতারাও কঠিন সময় পার করছেন। সেটি তাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহ এখনো আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা আশা করছি, অদূর ভবিষ্যতে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

রপ্তানিকারকদের মতে, পাঁচটি মৌলিক ধরনের পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কারণ এসব পণ্যের বাজারে সরবরাহ বেশি ও মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মতে, উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে না গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে না।

বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত ট্রাউজার, টি-শার্ট, বোনা কাপড়ের ফরমাল শার্ট, অন্তর্বাস ও সোয়েটার রপ্তানি করে। এই পাঁচ ধরনের পণ্য থেকেই মোট পোশাক রপ্তানির ৭৮ শতাংশ আসে। আর দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানা এই পাঁচ ধরনের পণ্যই উৎপাদন করে।

প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, মৌলিক ধরনের পোশাক বিক্রির পুরোনো ব্যবসায়িক মডেল এখন আর কার্যকর নেই। কারণ ভারত রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দেওয়ায় এই খাতে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

ফজলুল হকের মতে, উৎপাদন ব্যয় কমাতে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভিয়েতনাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কারণ দেশটির উৎপাদন ব্যয় স্থিতিশীল, মূল্য সংযোজন বেশি এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পৌঁছাতে সময়ও কম লাগে।

নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একটি ইউরোপীয় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পণ্যে বৈচিত্র্য না আনলে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানিও ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে। ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো আরও দূরের বিষয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান পাঁচটি পোশাকপণ্যের বৈশ্বিক বাজার ইতোমধ্যেই পরিপূর্ণ। এই পাঁচটি পণ্যে আর সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। সাশ্রয়ী দামে উন্নত মানের পোশাক উৎপাদনে যেতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) হারালে দেশের পোশাক আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ওই ক্রেতা বলেন, এলডিসি সুবিধা প্রত্যাহারের সময় কিছুটা পিছিয়ে গেলেও বড় বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা ইতোমধ্যে বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা শুরু করেছে।

তিনি আরও বলেন, ভারত যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পায়, তাহলে ইউরোপমুখী বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে ক্রেতারা আরও কম দামে পণ্য কিনতে চাপ দেবে।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, নতুন রপ্তানি আদেশ বাড়াতে আগামী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় রোডশো আয়োজন করবে সংগঠনটি।

তিনি জানান, বাজার বিশ্লেষণ, পণ্যের ধরন ও সর্বশেষ ফ্যাশন প্রবণতা নিয়ে রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে বিজিএমইএ একটি ডিজাইন স্টুডিওও গড়ে তুলছে, যেন তারা বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারেন।

Related Articles

Latest Posts