ফেরদৌসী মজুমদার এ দেশের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী। অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। টেলিভিশনের প্রথম নাটকে তার অভিনয় দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। বেতার, মঞ্চ, টিভি নাটক থেকে শুরু করে সিনেমা, সব মাধ্যমেই তিনি অভিনয় করেছেন। দীর্ঘ দিন রাজধানীর একাধিক নামীদামি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন।
এবারের ঈদে ‘জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’ নাটকে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছেন ফেরদৌসী মজুমদার। ১৮ জুন তার জন্মদিন; ৮৩ বছর পূর্ণ করলেন এই শিল্পী। সম্প্রতি রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে নিজ বাসায় বসে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন: এত মানুষ আপনাকে ভালোবাসেন, এই বয়সে এসে কেমন লাগে?
ফেরদৌসী মজুমদার: এটা কি বলে শেষ করা যায়? যায় না। মুখের ভাষায় এটা প্রকাশ করা যায় না। সে জন্যই আমি বলি, আমার কোনো অতৃপ্তি নেই, যা চেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি। আমি নিজেও বিস্মিত হয়ে যাই, কী এমন করেছি যার জন্য এত মানুষ আমাকে ভালোবাসে! পরে ভাবি, হয়তো কিছু একটা করেছি। এ জন্যই বলি, আমি অনেক বেশি পেয়েছি। আমার কোনো অতৃপ্তি নেই।
প্রশ্ন: শিল্পী হিসেবে বহু বছর ধরে শিল্পের একটা জীবন পার করছেন। কেমন অনুভব করেন?
ফেরদৌসী মজুমদার: টেরই পাইনি কেমন করে এতগুলো বছর কেটে গেল! কত কাজ করেছি। মঞ্চে বহু কাজ করেছি। কোনো নাটক এক শ বার, কোনোটা দুই শ বারও মঞ্চায়ন হয়েছে। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কতবার যে মঞ্চায়ন হয়েছে! কত শত মানুষ তা দেখেছেন, কত প্রশংসা পেয়েছি। শিল্পের সাথেই এতটা বছর কেটে গেল। শিল্পীজীবন, শিল্পের পথের এই জীবন আমার খুব ভালো লাগে।
প্রশ্ন: অভিনয়কে ঘিরে আপনার এখনকার চাওয়া কী?
ফেরদৌসী মজুমদার: আমার এখন যা বয়স, সেই অনুযায়ী যদি কেউ কোনো চরিত্র তৈরি করে, তাহলে করব। বয়স বেড়ে গেছে, কর্মক্ষমতা কমে গেছে। জাস্ট বসিয়ে রাখবে, এমন চরিত্র করার কোনো দরকার নেই। আমার উপযোগী কাজ হলে করব। এবারের ঈদে ‘জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’ করেছি। এই নাটকের জন্য অনেক প্রশংসা পেয়েছি। চমৎকার গল্পের একটি নাটক, যেখানে অভিনয় করার দারুণ সুযোগ ছিল। এ রকম কাজ হলে এই বয়সেও করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এখনকার নাটক নিয়ে কিছু বলুন।
ফেরদৌসী মজুমদার: এখন ভালো পাণ্ডুলিপি নেই। আসলে এখন নাট্যকারের খুব অভাব। আমি তো বিটিভি থেকেই এসেছি, কত শত নাটকে অভিনয় করেছি। এখনকার নাটকে সেই প্রাণটাই নেই। সেকালে তিন ক্যামেরায় নাটক হতো, কত যত্ন নিয়ে কাজ হতো তখন!
প্রশ্ন: ঢাকা শহরের উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ অনেক জায়গায় এখনো থিয়েটার নেই। এটা আপনাকে কতটা ভাবায়?
ফেরদৌসী মজুমদার: থিয়েটার তো আমাদের এখানে সবচেয়ে অবহেলিত। এখন তো আর অভিনেতারা অত প্রাণ দিয়ে, দরদ দিয়ে অভিনয় করতে পারেন না। আগের অভিনেতারা অনেক উৎসাহ নিয়ে মঞ্চে অভিনয় করতেন। একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে গেলে যে রকম শ্রম দিতে হয়, দরদ ও ভালোবাসা দিতে হয়, সময় দিতে হয়—তা এখন নেই। একটি চরিত্রের জন্য যে মনোযোগ দিতে হয়, তা আজকাল মঞ্চে খুব একটা দেখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা হলো পাণ্ডুলিপি। আর হলের সমস্যা তো আছেই। রাজধানীর উত্তরায় হল দরকার, মিরপুর, ধানমন্ডি, গুলশানে দরকার। এমন অনেক জায়গাতেই হল দরকার।
প্রশ্ন: আপনার অভিনীত হুরমতি চরিত্রটি তো দেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসেই জায়গা করে নিয়েছে…
ফেরদৌসী মজুমদার: তখন বাজারে গেলে, মার্কেটে গেলে কিংবা কোথাও গেলেই বলা হতো—‘হুরমতি বুয়া এদিকে আসেন, আমাদের দোকানে আসেন।’ কত সম্মান পেতাম, কত ভালোবাসা পেতাম! যেখানেই যেতাম, মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান পেতাম। তখন বুঝিনি এত নাম হবে। আমি শুধু মন দিয়ে কাজ করেছি, মন দিয়ে অভিনয় করেছি। এটা ইতিহাস সৃষ্টি করবে, রেকর্ড গড়বে এমনটা কখনো ভাবিনি।
প্রশ্ন: আপনার অভিনয়জীবনে প্রয়াত আবদুল্লাহ আল-মামুনের অবদান নিয়ে বলুন।
ফেরদৌসী মজুমদার: আমার অভিনয়জীবনে তার ভূমিকা অনেক। তিনি না থাকলে অনেক নাটক হতো না। রবীন্দ্রনাথের নাটক করেছি, সেখানেও তিনি আমাকে নিয়েছেন। আরও অন্য অনেক নাটকে আমাকে নিয়েছেন। তিনি আমাকে প্রচণ্ড উৎসাহ দিতেন। নতুন নতুন চরিত্র তৈরি করতেন। আমাকে ভেবেই নাটক লিখতেন। আমার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। আমি যে অভিনয় করতে পারি, আমার কিছুটা দক্ষতা আছে, এ ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিতেন।
প্রশ্ন: আপনার বাসায় হাজার হাজার বইয়ের সংগ্রহ। কোন ধরনের বই বেশি টানে?
ফেরদৌসী মজুমদার: রবীন্দ্রনাথের লেখা বেশি ভালোবাসি, সেই ছোটবেলা থেকেই। স্কুলজীবনে প্রথম ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়া শুরু করি। তখনই ভাবতাম, কী অসাধারণ লেখা! ভাবতাম—গান, কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস—সব শাখায় তিনি কীভাবে লিখে গেছেন! কী করে পেরেছেন? আরও ভাবি, একজীবনে যদি কেবল রবীন্দ্রনাথই পড়তে পারতাম! তার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা।
প্রশ্ন: বেতার, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটক ও মঞ্চ সব মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন। কোন মাধ্যমকে এগিয়ে রাখবেন?
ফেরদৌসী মজুমদার: অবশ্যই মঞ্চনাটককে। এখানে অভিনয় করেই বেশি তৃপ্তি পাই। সে জন্যই মঞ্চকে বেশি এগিয়ে রাখব। ওপার বাংলায় আমাদের আগে শুরু করেছে, আমরা পরে শুরু করেছি। মঞ্চ করতে এখানে পয়সাও লাগে। আবার পৃষ্ঠপোষকতারও অভাব রয়েছে। কেউ যে পৃষ্ঠপোষকতা করে না, তা নয়। আমরা নিজেদের অর্থ দিয়েই করি, ভালোবাসি বলেই করি। টাকা-পয়সা খরচ হলেও এ জন্য ভাবি না। তবে মঞ্চনাটকে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করলেও বহু বছর তো হয়ে গেল। এখানে আমাদের অর্জন কম নয়।
প্রশ্ন: একমাত্র মেয়ে ত্রপা মজুমদারের নির্দেশনায় কাজ করছেন, সে বিষয়ে কিছু বলুন।
ফেরদৌসী মজুমদার: ত্রপার ভাবনাগুলো সুন্দর, ওর চিন্তাগুলো সুন্দর। মেয়ে হোক, বন্ধু হোক, ছেলেমেয়ে বা বয়স যা-ই হোক না কেন—পরিচালক তো পরিচালকই। সর্বশেষ ত্রপার পরিচালনায় মঞ্চে ‘লাভ লেটারস’ নাটকে অভিনয় করছি। ‘মুক্তি’ নামে একটি নাটক ওর পরিচালনায় করেছি। পরিচালককে তো মানতেই হবে, সব শিল্পীরই মানা উচিত। মেয়ে ধমকাচ্ছে, বলছে—চোখে চশমা নাই। এসবেরও আনন্দ আছে। ওর নির্দেশনায় কাজ করে আমি খুব আনন্দ পাই।
প্রশ্ন: একই দিনে আপনার ও মেয়ে ত্রপা মজুমদারের জন্মদিন।
ফেরদৌসী মজুমদার: আগে এটা নিয়ে খুবই রোমাঞ্চ কাজ করত, এখন সেটা কমে আসছে। আগে তো ও আমার কাছেই থাকত, এখন ওর আলাদা সংসার হয়েছে। রাত ১২টা বাজলেই হইচই, আনন্দ শুরু হতো। সবাই মিলে খুব আনন্দ করতাম।
প্রশ্ন: অভিনয়জীবনের বাইরে ঢাকার একাধিক নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ফেরদৌসী মজুমদার: খুবই ভালো ছিল। অনেক বছর ধরে সম্মানের একটা পেশায় ছিলাম। এখনো আমার ছাত্রদের সঙ্গে কখনো দেখা হলে তারা যে সম্মান করে, তা বলে বোঝানো যাবে না। একজন ছাত্রী একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আপা আপনি তো ক্লাসে চকলেট খেতে দিতেন, গল্প করতেন।’ ওরা যে এখনো সেসব মনে রেখেছে, এটাই অনেক। আজিমপুর অগ্রণী ব্যাংক স্কুল, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল, সানবিমস স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। ওই দিনগুলো খুব মধুর ছিল।
প্রশ্ন: লেখালেখির জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন…
ফেরদৌসী মজুমদার: চেষ্টা করেছি কিছু লেখালেখি করার। ‘মনে পড়ে’ নামে একটি বই লিখেছি। একটা সময় মনে হয়েছে, আমার লেখা উচিত। ভাইবোন কেমন ছিলেন, বাবা কেমন ছিলেন, আব্বা কেমন ছিলেন? এভাবেই স্মৃতি ধরে রাখার জন্য লিখেছি। ‘অভিনয়জীবন আমার’ নামেও একটি বই লিখেছি। আরও একটি স্মৃতিকথামূলক বই লিখেছি।

