ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরোপিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থ পরিশোধ বিঘ্নিত হওয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে রপ্তানি, শ্রম অভিবাসন এবং প্রধান উন্নয়ন সহযোগিতা কার্যক্রম বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এরসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার অভিবাসী কর্মী বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন না। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নেওয়া রুশ ঋণ পরিশোধের বিষয়টিও স্থবির হয়ে পড়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় চেয়ে ঢাকা ওয়াশিংটনের দ্বারস্থ হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ ও রাশিয়া নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন সহজ করতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে চলমান মডেল অনুসরণ করে ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত এসবার ব্যাংকের একটি শাখা খোলার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, গত জুনের শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফরের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয় ছিল অর্থ পরিশোধের একটি সমাধান খুঁজে বের করা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বর্তমানে ভূ-রাজনীতি সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে, কারণ বহুপক্ষীয় সংস্থা এবং তাদের নিয়মকানুনগুলো এখন অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, পণ্য আমদানিতে বিঘ্ন এবং আর্থিক নানা বিধিনিষেধের মাধ্যমে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোই এর পরিণতি ভোগ করছে।’
রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৭ মিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে রাশিয়া থেকে আমদানি ৪৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে মূলত গম ও সার আমদানি করে। এমনকি এসব আমদানির ক্ষেত্রেও আমাদের অর্থ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা সামরিক সরঞ্জামও আমদানি করতে পারছি না। অন্যদিকে, আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা তাদের পাওনা অর্থ বুঝে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদার অভাব এখন আর প্রধান সমস্যা নয়; আসল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রপ্তানি করা পণ্যের অর্থ বা ‘এক্সপোর্ট প্রসিড’ সংগ্রহ করতে না পারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ২০২৪ সালের শুরু থেকে পাঠানো চালানের বিপরীতে অন্তত আটজন পোশাক রপ্তানিকারক এখন পর্যন্ত তাদের পাওনা আদায় করতে পারেননি।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বকেয়া পড়ে আছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, রাশিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর রুশ ক্রেতারা শুরুতে চীনা ব্যাংকের মাধ্যমে চীনা ইউয়ানে রপ্তানিকারকদের পাওনা পরিশোধ করতেন। তবে প্রায় দুই বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তার পর ওই ব্যাংকগুলো লেনদেন বন্ধ করে দেয় এবং অর্থ রাশিয়ায় ফেরত পাঠায়।
হাতেম জানান, পরে রপ্তানিকারকরা থাইল্যান্ডের একটি ব্যাংকের মাধ্যমে মার্কিন ডলারে কিছু পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন, তবে এখনো চার মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বকেয়া রয়ে গেছে।
এ ছাড়া এ শিল্প খাত ১০ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় রপ্তানি আদেশ হারিয়েছে। পোল্যান্ডের এক রিটেইলার প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি বাতিল করে দেওয়ায় এমনটি ঘটেছে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাক প্রথমে পোল্যান্ডে পাঠানোর কথা ছিল এবং সেখান থেকে স্থলপথে তা রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দেশের অর্থনীতি যখন চাপে রয়েছে, তখন সরকার রপ্তানি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া এখনো একটি বিপুল সম্ভাবনাময় বাজার, কিন্তু অর্থ লেনদেন বা পেমেন্ট সেটেলমেন্ট এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা
কর্মকর্তাদের অনুমান, রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে কর্মরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক তাদের অর্জিত আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠাতে পারছেন না।
খলিলুর রহমানের মস্কো সফরে দুই দেশ আগামী এক বছরে এক লাখ পর্যন্ত বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের বড় উদ্যোগের জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রয়োজন হবে, তবে তার আগে লেনদেন বা অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা জরুরি।
মস্কোয় নিযুক্ত একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বলেন, প্রবাসী কর্মীরা যতক্ষণ পর্যন্ত বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন না, ততক্ষণ সেই বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যোগ হচ্ছে না।
স্থগিত হয়ে আছে রূপপুরের ঋণের কিস্তি
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে জটিল হয়ে পড়েছে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করেছে রাশিয়া।
মূল চুক্তি অনুযায়ী ঋণের অর্থ মার্কিন ডলারে পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার প্রধান ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ডলারে অর্থ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাশিয়া বারবার তাদের পাওনা চেয়েছে এবং বিকল্প হিসেবে রুবলের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ চীনা ব্যাংকের মাধ্যমে এই লেনদেন সম্পন্ন করার চেষ্টা করলেও সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
২০২২ সালের আগে বাংলাদেশ সুদ এবং অগ্রিম কিস্তি বাবদ প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল। এরপর থেকে আরও প্রায় এক বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে আছে, কারণ আইনি জটিলতার কারণে এই অর্থ রাশিয়ায় স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, রাশিয়া ভারতীয় রুপিতে ঋণ নিষ্পত্তির প্রস্তাবও দিয়েছে, তবে সেই প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত একটি কূটনৈতিক বিষয়, কোনো আর্থিক সমস্যা নয়। বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে বকেয়া কিস্তির অর্থ নির্ধারিত এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত রুশ কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়েনি, কারণ তাদের পাওনা একটি স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প পথের সন্ধান
২০২২ সাল থেকে বেশ কয়েকটি লেনদেন পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখেছে দুই দেশ। তবে কোনোটিই এখন পর্যন্ত পুরোপুরি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। কর্মকর্তারা এখন বাংলাদেশে রাশিয়ার এসবার ব্যাংকের একটি শাখা খোলার প্রস্তাবকে একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছেন।
মস্কো সফরকালে খলিলুর রহমান এসবার ব্যাংকের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার ভেদিয়াখিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেন সহজতর করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
এসবার ব্যাংক এরইমধ্যে ভারতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ভারতীয় শাখা বর্তমানে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার অধিকাংশ লেনদেন নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন করছে।
এ ছাড়া ব্যাংকটি রুশ রপ্তানিকারকদের রুপিতে ঋণ দেওয়ার সুবিধা বাড়িয়েছে এবং লেনদেনের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা মনে করেন, একই ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু করা গেলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আর্থিক লেনদেন পুনরায় স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশেষভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে যখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক সেই সময়ে জ্বালানি খাতে রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে।
‘এর ফলে মস্কোর সাথে ঢাকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব ও ঝুঁকি—উভয়ই এখন অনেক বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও এখন একই ধরনের উভয় সংকটের মুখে পড়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক চাহিদার কথা বিবেচনা না করেই পশ্চিমা দেশগুলো যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এই দেশগুলোকে।’
কুগেলম্যানের পরামর্শ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বর্তমান স্থিতিশীল সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা শিথিলতার আবেদন করতে পারে। এতে করে রাশিয়ার সঙ্গে বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেনের কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়ার ঝুঁকি কমবে।

