চঞ্চল চৌধুরী দর্শকনন্দিত অভিনয়শিল্পী। একাধিকবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ‘মনপুরা’ দিয়ে বড় পর্দায় আলোচনায় আসার পর একের পর এক সিনেমা ও ওটিটির কাজে দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন।
সাফল্যের এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা সহজ ছিল না। চারুকলায় পড়ার সময় টিউশনি করে অর্থ জমিয়েছেন, মঞ্চে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন বড় সুযোগের জন্য।
ফেলে আসা দিনের গল্প বলতে গিয়ে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ১৯৯৬ সালে আরণ্যক নাট্যদল থেকে ডাক পান তিনি। এর আগে সেখানে আবেদন করেছিলেন। প্রথমে প্রায় ২০০ জনকে ডাকা হয়। সেখান থেকে ২০ জন এবং পরে চূড়ান্তভাবে আটজনকে বেছে নেওয়া হয়। সেই আটজনের একজন ছিলেন চঞ্চল।
আরণ্যক থেকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নিজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলেই জানিয়েছিলেন চঞ্চল। তিনি বলেছিলেন, ‘অভিনয়ের অতীত কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। আপনারা যা দেবেন, তাই করব। তবে অভিনয় না পারলেও গান জানি।’
সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন আজিজুল হাকিম ও মান্নান হীরা। চঞ্চলের সরলভাবে কথা বলাটা তাদের ভালো লেগেছিল বলে মনে করেন তিনি। পরে আরণ্যক নাট্যদলের একটি কর্মশালায় অংশ নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার মঞ্চযাত্রা।
এরপর টানা ১০ বছর মঞ্চে কাজ করেছেন চঞ্চল। মঞ্চনাটকের শুরুতে যা যা করতে হয়, তার প্রায় সবই করেছেন। শুরুতেই অভিনয়ের সুযোগ পাননি। একসময় ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকের একটি শোতে হারমোনিয়াম বাদক অভিনয় করতে পারবেন না বলা হয়। তখন অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু চঞ্চলের নাম প্রস্তাব করেন। শুধু বলেছিলেন, ‘ও পারবে।’
সেই নাটকে চঞ্চলের সংলাপ ছিল মাত্র দুই-তিনটি। তাতেই তিনি খুশি ছিলেন।
টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের শুরুটাও ছিল এমনই ছোট ছোট সুযোগ দিয়ে। মামুনুর রশীদের রচনা ও পরিচালনায় ‘সুন্দরী’ ধারাবাহিকে মাত্র দুটি দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন তিনি। চরিত্রটি ছিল একজন সাংবাদিকের। সহশিল্পী ছিলেন বিপাশা হায়াত।
এরপর এক দৃশ্য, দুই দৃশ্য করে টেলিভিশনে কাজ করতে থাকেন চঞ্চল। তখন টেলিভিশন চ্যানেলও ছিল হাতে গোনা। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতে তার লেগে যায় ১০ থেকে ১২ বছর। কিন্তু হাল ছাড়েননি।
‘বছরের পর বছর ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছি। বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল না, বড় কোনো স্বপ্নও ছিল না। শুধু মঞ্চনাটককে ভালোবেসে কাজ করে গেছি,’ বলেন চঞ্চল।
ধীরে ধীরে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপনে মডেল হওয়ার সুযোগ পান। বিজ্ঞাপনটিতে মায়ের জন্য মোবাইল ফোন কিনে বাড়ি ফিরছিলেন এক সন্তান। বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এটি প্রচারের পর সারা দেশে পরিচিতি পান চঞ্চল। বাড়তে থাকে কাজের প্রস্তাবও।
এরপর ‘তালপাতার সেপাই’ ও ‘নিখোঁজ সংবাদ’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। তখনও অভিনয় করে অর্থ উপার্জন করবেন, এমনটা ভাবেননি। দীর্ঘদিন আর্থিক কষ্টের মধ্যেই কেটেছে তার জীবন।
পরিবারের কথাও স্মরণ করেন চঞ্চল। অনেক ভাইবোনের সংসারে বাবা ছিলেন শিক্ষক। চারুকলায় পড়ার সময় টিউশনি করে টাকা জমিয়েছিলেন। তিন-চার বছর টিউশনি করে সেই টাকা দিয়ে একটি হারমোনিয়াম কিনেছিলেন।
‘ওই হারমোনিয়ামের প্রতি আমার প্রবল ভালোবাসা ছিল। এখনো আছে। টিউশনি করে টাকা জমিয়ে হারমোনিয়াম কিনেছিলাম,’ বলেন তিনি।
২০০৫ সালের পরের দিকে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘এনেছি সূর্যের হাসি’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের সুযোগ পান চঞ্চল। নাটকটি করার পর আরও বেশ কিছু ভালো কাজের প্রস্তাব আসতে থাকে। সালাহউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় কাজ করার পর তার নাটকেও নিয়মিত অভিনয় করেন তিনি।
এরপর আসে সিনেমায় বড় সুযোগ। নাটকে কাজ করতে করতেই গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পান চঞ্চল। তার বিপরীতে অভিনয় করেন ফারহানা মিলি।
২০০৯ সালে মুক্তির পর ‘মনপুরা’ দর্শকের ব্যাপক ভালোবাসা পায়। সিনেমাটির মাধ্যমে বড় পর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন চঞ্চল চৌধুরী।
‘মনপুরা’ তার অভিনয়জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দর্শক তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। সেই ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞ চঞ্চলও।
‘মনপুরা’ শুধু তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, দীর্ঘদিনের সাধনা ও অপেক্ষারও যেন একটি বড় স্বীকৃতি হয়ে এসেছিল।

