১৩ বছর ধরে কারাগারে ঐশী, আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় স্বজন

১৯ বছর বয়সে বাবা-মাকে হত্যা করেছিলেন ঐশী রহমান। সেই ঘটনায় করা মামলায় ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দি তিনি। এখন তার বয়স ৩২। আদালতে এক পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমে যাবজ্জীবন হয়। এর বিরুদ্ধে করা হয়েছে আপিল, কিন্তু মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। খালাস চেয়ে ঐশীর করা আপিল সুপ্রিম কোর্টে পড়ে আছে নয় বছর ধরে।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দুদিন পর ১৯ বছর বয়সী ঐশী আত্মসমর্পণ করে হত্যার কথা স্বীকার করেন।

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

২০১৭ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন ঐশী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ২০১৮ সালের মে মাসে তার মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আরেকটি আপিল করে।

তবে আপিল দুটির শুনানি এখনো শুরু হয়নি। আদালত সূত্র বলছে, আপিলগুলো নিষ্পত্তির জন্য শুনানির তালিকায় আসেনি। এছাড়া দ্রুত শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরাও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি।

ঐশীর চাচা মোহাম্মদ মশিউর রহমান রুবেল হত্যা মামলাটি করেছিলেন। তিনি বলেন, প্রায় এক-দুই মাস পরপর আমি কারাগারে ঐশীর সঙ্গে দেখা করি। সম্প্রতি তাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে গাজীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়েছে। তার অ্যাজমা আছে।

তিনি বলেন, সে যে অনুতপ্ত, সেকথা আমাকে বলেছে। তার কথায় মনে হয়েছে, সে নিজের অপরাধ বুঝতে পেরেছে। আমরাও তার খালাস চাই।

মশিউর রহমান একজন ঠিকাদার, থাকেন ময়মনসিংহে। তিনি বলেন, আমি আর্থিক সংকটে আছি। ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। জমি বিক্রি করতে পারলে ঐশীর খালাসের জন্য করা আপিলটা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মামলাগুলোর শুনানির ক্রম ও অগ্রাধিকার মূলত প্রধান বিচারপতিই নির্ধারণ করেন। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দেরি হবে না, এ বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারি। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষও কোনো মুলতবি চাইবে না।

ঐশীর পক্ষে হাইকোর্টে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আফজাল এইচ খান। তিনি বলেন, আপিলটির দ্রুত শুনানির জন্য তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ঐশীর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না।

২০১৩ সালে বাবা-মাকে হত্যা করার পর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকার আদালতে ঐশীর মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে। পরে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।

২০১৭ সালের ৫ জুন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

ওই বছরের ২২ অক্টোবর হাইকোর্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় প্রকাশ করেন। সেখানে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কমানোর পক্ষে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়।

রায়ে বলা হয়, ঐশী ‘কোনো আপাত উদ্দেশ্য ছাড়াই’ তার বাবা-মাকে হত্যা করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি ‘মানসিক বিপর্যয় বা কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায়’ ভুগছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।

রায়ে আরও বলা হয়, ঐশীর ডিম্বাশয়ে সিস্ট ও ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ছিল। তার দাদি ও মামার মানসিক রোগের ইতিহাসও ছিল।

হাইকোর্ট আরও বিবেচনায় নেয় যে, ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর। এর আগে তার বড় কোনো অপরাধের ইতিহাস ছিল না। ঘটনার দুদিনের মধ্যেই তিনি স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

Related Articles

Latest Posts