ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি বহর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে আরও কয়েক হাজার সেনা। ইরান যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশের সময় দুই পক্ষই সামরিক সংঘাত বাড়ানো কিংবা কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। এমন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অর্থ কী? এটি কি ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত? নাকি আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছে ওয়াশিংটন?
নতুন যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি বহর রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর একদিন পর ওই অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করেছে মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ)। এ ইউনিটে রয়েছে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, নতুন এই রণতরি বহর ও নৌবাহিনীর অন্যান্য সরঞ্জাম মোতায়েনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আরও ৯ থেকে ১০ হাজার সেনা, নাবিক ও মেরিন সদস্য ওই অঞ্চলে যুক্ত হতে পারেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং উভচর অভিযানে সক্ষম দুটি সামরিক দল অবস্থান নেবে।
এই বিপুল সামরিক উপস্থিতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও বিস্তৃত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানান, নতুন মোতায়েনে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে নতুন করে সামরিক শক্তি যুক্ত হবে।
পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে নুরি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই এগোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প খোলা রাখাই এই মোতায়েনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও আপাতত সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই পেন্টাগনের।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ট্রাম্প নতুন করে হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালাতে ‘প্রস্তুত’ রয়েছে।
আগে থেকেই কত মার্কিন সেনা ছিল
গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সেনা মোতায়েনের ঘটনা ঘটে ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে। লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে মার্কিন সেনা পাঠানো হয়েছিল। সে সময় লেবাননে মার্কিন মেরিন ও স্থলসেনার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজারে পৌঁছেছিল।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা অবস্থান করছিলেন। তারা বড় স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট অগ্রবর্তী সামরিক স্থাপনাতেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প। শুরুতে আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মতো বিমানবাহী রণতরি ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়।
যুদ্ধের আগে যে প্রস্তুতি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র
উন্মুক্ত সূত্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও সামরিক উড়োজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি উড়োজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান বাহিনীর এটিই সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ।
মোতায়েন করা উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি আকাশপথে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উড়োজাহাজ (অ্যাওয়াকস), এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম এফ-২২ এবং এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।
উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, এসব উড়োজাহাজের অনেকগুলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গেছে। এগুলোর সঙ্গে ছিল মালবাহী উড়োজাহাজ ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তুতি নিয়মিত সেনা বা সরঞ্জাম পরিবর্তনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
গত মার্চে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল পেন্টাগন। সে সময় তিনটি পৃথক সামরিক দল মোতায়েন করা হয়।
প্রথম দলটি ছিল ইউএসএস ত্রিপোলিকে কেন্দ্র করে গঠিত ত্রিপোলি উভচর প্রস্তুতি বহর এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট।
দ্বিতীয় দলটি ছিল ইউএসএস বক্সারকে কেন্দ্র করে গঠিত বক্সার উভচর প্রস্তুতি বহর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট।
এই দুটি মেরিন ইউনিটের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেরিন সেনা ও নাবিক যুক্ত হন।
তৃতীয় দলটিতে ছিল নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থানরত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বাহিনীর প্রায় ২ হাজার সেনা। এই পদাতিক বাহিনী মূলত প্যারাস্যুটের মাধ্যমে শত্রু এলাকায় অবতরণ করে অভিযান চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
নতুন মোতায়েন কীসের ইঙ্গিত?
নতুন সেনা মোতায়েনের অর্থ যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা আরও জোরদার করা ‘সম্ভব’।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাদের তা বলতে পারব না। কারণ, আপনারা জানতে চাইছেন, কোথায় বোমা হামলা চালানো হবে?’
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান শক্ত করতেও নতুন সেনা মোতায়েন করা হতে পারে।
গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে খুলে দেওয়ার একটি নতুন প্রস্তাব পাঠায় ইরান। তবে এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানায় তেহরান। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দেওয়া।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় আনতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, প্রস্তাবটিতে এমন কিছু বিষয় ছিল, যা তিনি ‘এক বছর আগেও অনুমোদন করতেন না, এখনো করবেন না’।
সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইরানের রেল ও গাড়ি উৎপাদন খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থমন্ত্রণালয় বলেছে, নতুন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য তেহরানের অবশিষ্ট রাজস্বের উৎস সংকুচিত করা। এর আগের মাসে ইরানের পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা অন্যান্য দেশের ওপরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।
কূটনৈতিক আলোচনা কোন পর্যায়ে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা চলছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের আলোচনা হয়। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্যতম প্রধান মতপার্থক্য হিসেবে উঠে আসে।
ওই আলোচনায় কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি রূপরেখা তুলে ধরে ইরান। প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে।
ট্রাম্প এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসিকে বলেন, ইরানের প্রস্তাবে জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার যে দাবি জানানো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘এগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নয়, এগুলো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা।’ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসিকে বলেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তার জন্য তেহরান ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’। তবে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমরা যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এসেছি।’
বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ‘খুব শিগগির’ শেষ হবে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট মোটরসের একটি কারখানায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানকে হয় ‘খুবই যথাযথ ও বুদ্ধিমানের মতো কিছু করতে হবে, নয়তো তারা বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না’।
ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে দেশটি তা মেনে চলবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘একটি কোম্পানির সঙ্গে আমি যখন কোনো চুক্তি করি, তখন আপনারা জানেন, তারা তা মেনে চলবে। কিন্তু তাদের (ইরান) সঙ্গে চুক্তি করলে তারা সেটি না-ও মানতে পারে।’

