হাতখরচের টাকা জোগাড় থেকে বিশ্বমঞ্চে: অদম্য পেনসোর জয়গাথা

আটলান্টা স্টেডিয়াম। বৃহস্পতিবার যখন রেফারি টোরি পেনসো বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ‘এ’ গ্রুপের ম্যাচটি শুরুর সংকেত দেন, তা কেবল আর দশটা সাধারণ ফুটবল ম্যাচের সূচনা ছিল না। বরং ৩৯ বছর বয়সী এই আমেরিকান পা রাখেন ফুটবলের ইতিহাসের পাতায়।

ছেলেদের ফিফা বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করা ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় নারী রেফারি পেনসো। তার সহকারীর ভূমিকায় ছিলেন আরও দুই নারী— ব্রুক মায়ো ও ক্যাথরিন নেসবিট। ফরাসি রেফারি স্তেফানি ফ্রাপার ও তার সহকারীরা অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন গত কাতার বিশ্বকাপে। ছেলেদের বিশ্বকাপে পুরোপুরি নারী রেফারিদের প্যানেল দিয়ে ম্যাচ পরিচালনার তা ছিল প্রথম ঘটনা।

পেনসোর জন্য মুহূর্তটি ছিল এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর যাত্রার চূড়ান্ত প্রাপ্তি, যার শুরুটা কোনো জমকালো বা উপচে পড়া স্টেডিয়ামে হয়নি, হয়েছিল ফ্লোরিডার ছিমছাম স্থানীয় মাঠগুলোতে। ফ্লোরিডার স্টুয়ার্টে জন্ম নেওয়া পেনসোর ফুটবলের সঙ্গে প্রথম সখ্য দুই বড় ভাইয়ের হাত ধরে। আর দশটা শিশুর মতো তারও প্রথম স্বপ্ন ছিল মাঠে ফুটবলার হিসেবে দাপিয়ে বেড়ানো। তবে ভাগ্য তার জন্য লিখে রেখেছিল ভিন্ন এক গল্প।

হাতখরচের টাকা জোগাড় করতে মায়ের পরামর্শে ১৯৯৯ সালে বয়সভিত্তিক ম্যাচগুলোতে রেফারির দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেন পেনসো। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ওই একটি সিদ্ধান্তই তার জীবনের বাঁক বদলে দেয়। ঠিক একই বছর যুক্তরাষ্ট্র নারী ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করে। ফাইনালে চীনের বিপক্ষে ব্র্যান্ডি চ্যাস্টেইনের সেই বিখ্যাত পেনাল্টির কল্যাণে শিরোপা জেতে তারা। কিশোরী পেনসোর মনে চ্যাস্টেইনের সেই বুনো উদযাপনের দৃশ্য এক গভীর রেখাপাত করেছিল।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি রোমন্থন করে পেনসো বলেন, ‘সেবারই প্রথম কোনো নারীকে আমি পুরোপুরি অ্যাথলেট হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। সেটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল।’

সপ্তাহান্তের খণ্ডকালীন কাজটা দেখতে দেখতেই রূপ নেয় গভীর ভালোলাগায়। রেফারিং তাকে আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, যার সুবাদে অর্জিত টাকা দিয়ে নিজের প্রথম গাড়িটি কিনেছিলেন তিনি। পাশাপাশি মাঠের ভেতরের অভিজ্ঞতা তাকে জীবনের কঠিন শিক্ষাগুলোও অর্জনে সহায়তা করে।

ফক্স স্পোর্টসকে পেনসো বলেন, ‘খুব কম তথ্য হাতে নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মাঠে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস— যেখানে গ্যালারিতে অনেক সময় মা-বাবারা চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন— এসব কিছুই আমাকে এমন কিছু দক্ষতা শিখিয়েছে, যা পরবর্তী ক্যারিয়ারে ভীষণ কাজে লেগেছে।’

মাঠের প্রতি ভালোবাসা বাড়লেও শুরুতে রেফারিংকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবেননি। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় মার্কেটিং বিভাগে কাজ করার পাশাপাশি সুযোগমতো ম্যাচ পরিচালনা করে যাচ্ছিলেন। ২০২৩ সালে ফিফার কাছে তিনি বলেছিলেন, ‘সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো পূর্ণকালীন নারী রেফারি ছিলেন না। তাই এটিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা মাথায় আসেনি।’

তবে ধীরে ধীরে সুযোগের দুয়ার খুলতে থাকে। পরিবারের সমর্থনে তিনি পেশাদার রেফারিংয়ে মনোযোগ দেন এবং আমেরিকান ফুটবলের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ওপরে উঠতে থাকেন। টেক্সাসে অলিম্পিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের অধীনে আয়োজিত একটি রেফারিং ক্যাম্প তার ক্যারিয়ারের গতি বাড়িয়ে দেয়।

ওই সময়েই তিনি বিয়ে করেন ক্রিস পেনসোকে, যিনি নিজে মেজর সকার লিগের (এমএলএস) একজন রেফারি এবং পরবর্তীতে ফিফা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) হিসেবে স্বীকৃতি পান। একই পেশায় থাকায় তাদের ঘরের আলোচনাতেও অবধারিতভাবেই ফুটবল আর রেফারিং প্রাধান্য পায়। পেনসো বলেন, ‘ক্রিসের সঙ্গে রেফারিং নিয়ে আমার চমৎকার আলোচনা হয়, যা ম্যাচ পরিচালনার সময় যে কোনো বিষয়কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে আমাকে সাহায্য করে।’

এরপর শুধুই ইতিহাস গড়ার গল্প। ২০২০ সালে দীর্ঘ দুই দশকের খরা কাটিয়ে প্রথম নারী হিসেবে এমএলএসের কোনো ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। এর মাত্র এক বছর পর ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারিদের তালিকায় নাম লেখান। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলকটি আসে ২০২৩ সালে। সিডনিতে স্পেন ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি পরিচালনার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রথম নারী হিসেবে ফিফা নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে রেফারির দায়িত্ব পান তিনি।

সেটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে। পেনসোর ভাষায়, ‘(কিংবদন্তি রেফারি) পিয়েরলুইজি কলিনা যখন জার্সিটা ঘুরিয়ে আমার নামটা দেখান, আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আমার জীবনে আর হতে পারে না।’

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্যারিস অলিম্পিক, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ও এমএলএসের ডজন ডজন ম্যাচ মিলিয়ে নিজেকে অন্যতম সম্মানিত ম্যাচ অফিসিয়াল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাফল্যের এই চূড়ায় পৌঁছানোর পেছনে জড়িয়ে আছে তার পরিবারের প্রেরণা। প্রতিটি ম্যাচ শুরুর আগে স্বামী ও তিন মেয়ের একটি ছবি নিজের সঙ্গে রাখেন পেনসো।

একবার ‘শি-বিলিভস কাপ’-এর এক অনুষ্ঠানে তার মেয়েদের একটি বাক্য সম্পূর্ণ করতে বলা হয়েছিল, যার শুরুটা ছিল ‘আই বিলিভ দ্যাট…’ দিয়ে (আমি বিশ্বাস করি যে…)। এক মেয়ে লিখেছিল, সে পেশাদার ফুটবলার হবে। আরেকজন লিখেছিল, সে কখনো ফুটবল খেলা ছাড়বে না। তবে ছোট মেয়ের ভাবনা ছিল আলাদা। সে লিখেছিল, বড় হয়ে রেফারি হতে চায়।

যে পেনসো একদিন সামান্য কিছু ডলারের আশায় স্থানীয় মাঠে বাঁশি হাতে নেমেছিলেন, তার জন্য এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে!

আটলান্টার সবুজ ঘাসে যখন তিনি পা রাখেন, তখন গ্যালারিতে থাকা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পেনসো নিজেই হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। কারণ, কখনও কখনও বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানোর গল্পটা শুরু হয় পাড়ার মাঠে কোনো এক সাধারণ কিশোরীর অদম্য স্বপ্ন থেকেই।

Related Articles

Latest Posts