হরমুজ প্রণালি থেকে যেভাবে মাইন অপসারণ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযান শুরু করেছে, তা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও বাস্তবে এটি একটি ধীর, জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সাবেক নৌ-কর্মকর্তা ও শিল্পবিশেষজ্ঞরা।

রয়টার্স বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের হামলার পর থেকেই তেহরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রণালিটিকে নিরাপদ করতে এবং জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারে মাইন অপসারণ অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে দুটি যুদ্ধজাহাজ প্রণালি দিয়ে পাঠিয়েছে এবং শিগগিরই পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোনসহ অতিরিক্ত বাহিনী এই অভিযানে যোগ দেবে। যদিও ব্যবহৃত সরঞ্জাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি, তবে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।

রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, ইরান সম্প্রতি প্রণালিতে প্রায় এক ডজন মাইন পেতে রেখেছে। তবে সেগুলো ঠিক কোথায় বসানো হয়েছে, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সব মাইন পাতা জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তেহরান নতুন করে আরও মাইন স্থাপন করতে পারে।

নৌ-মাইন যুদ্ধের কার্যকারিতা এখানেই—এগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা, কিন্তু অপসারণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এমনকি মাইন থাকার আশঙ্কা থাকলেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

আগে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী মাইন অপসারণে মানুষচালিত জাহাজ ব্যবহার করত, যা সরাসরি মাইনফিল্ডে প্রবেশ করে সোনার প্রযুক্তি দিয়ে মাইন শনাক্ত করত এবং যান্ত্রিক সরঞ্জাম দিয়ে সেগুলো অপসারণ করত। অনেক সময় ডুবুরিদেরও ব্যবহার করা হতো। তবে এই পুরোনো বহরের বড় অংশই এখন অবসরে চলে গেছে।

এর পরিবর্তে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ‘লিটোরাল কমব্যাট শিপ’, যা তুলনামূলক হালকা এবং এতে আধুনিক মাইন-শিকার প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। এসব জাহাজে আধা-স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, পানির নিচের যান এবং রিমোট-নিয়ন্ত্রিত রোবট ব্যবহার করা হয়, যা নৌ-সদস্যদের সরাসরি ঝুঁকি থেকে দূরে রাখে। বর্তমানে এ ধরনের তিনটি জাহাজ মোতায়েন রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাইন অপসারণ সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে পানির নিচের ড্রোন, ঐতিহ্যবাহী অ্যাভেঞ্জার-শ্রেণির চারটি জাহাজ, হেলিকপ্টার এবং ডুবুরি দল। তবে বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।

মাইনের ধরন ও অপসারণ পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের হাতে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন রয়েছে। এর মধ্যে আছে সমুদ্রতলে স্থাপিত ‘বটম মাইন’, পানির ওপরে ভাসমান বা নোঙর করা ‘টেথার্ড মাইন’, মুক্তভাবে ভাসমান ‘ড্রিফট মাইন’ এবং জাহাজের গায়ে লাগানো ‘লিম্পেট মাইন’।

মাইন অপসারণ প্রক্রিয়ায় প্রথমে ড্রোন বা সোনারযুক্ত যান ব্যবহার করে সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করা হয়। এরপর সেই তথ্য নিরাপদ দূরত্বে থাকা অপারেটরদের কাছে পাঠানো হয়, যারা বস্তুটির প্রকৃতি নির্ধারণ করে। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কীভাবে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হবে।

মাইন ধ্বংসে ব্যবহৃত হতে পারে ‘আর্চারফিশ’ নামের একটি রিমোট-নিয়ন্ত্রিত ডিভাইস, যা টর্পেডোর মতো দেখতে এবং এতে বিস্ফোরক থাকে। এটি ক্যামেরার মাধ্যমে অপারেটরদের কাছে তথ্য পাঠায় এবং লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে। এ ছাড়া মাইন বিস্ফোরণ ঘটাতে টেনে নেওয়া যন্ত্রযুক্ত চালকবিহীন নৌযানও ব্যবহার করা হতে পারে। প্রয়োজনে ডুবুরিদেরও কাজে লাগানো হয়।

ধীর ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পুরো প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে ইরানের হামলা অভিযানকে ধীর করতে পারে এবং ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এজন্য মাইন অপসারণকারী দলকে সুরক্ষা দিতে যুদ্ধজাহাজ ও আকাশপথে ড্রোন মোতায়েন করা হতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, মাইন খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। ফলে এই সক্ষমতা নিজেই ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি

মাইন অপসারণের গতি বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। উন্নত সোনার প্রযুক্তি একাধিক দিক থেকে একসঙ্গে স্ক্যান করতে সক্ষম, যা আগে একাধিকবার স্ক্যান করার প্রয়োজন হতো। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডেটা বিশ্লেষণ দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করা, যা একসঙ্গে মাইন খুঁজে বের করা, শনাক্ত করা এবং ধ্বংস করতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ শুধু একটি সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সংকট, যার সমাধান সহজ নয়।

Related Articles

Latest Posts