হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইরান।
আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ইরানের এই ঘোষণার আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ মেটাতে পুনরায় আলোচনায় ফিরতে সম্মত হয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
সাম্প্রতিক সময়ে, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চালু হওয়া যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়ে যায়।
হরমুজ প্রণালীর সীমান্তবর্তী দুই দেশ ওমান ও ইরান। এ পথেই বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও রপ্তানি করা হয়। অন্তত, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত দেখা দেওয়ার পর বিষয়টা এমনই ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা শুরু করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় থেকে আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা পেতে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখে তেহরান।
এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ‘হরমুজ প্রণালি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রেখেছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সামাজিক মাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘মাসকাট সফরকালে যুগ্ম হরমুজ কমিটির প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে (হরমুজ) প্রণালি নিয়ে যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নিয়ে মত বিনিময় করেছি।’
কয়েক ঘণ্টা আগেই ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিটি বিষয় নিয়ে কারিগরি আলোচনা যথারীতি চলবে। আপাতত উভয়পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং এখন থেকে জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিবৃতির বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইরান।
সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ সর্বপ্রথম নতুন করে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধে দুই পক্ষের সম্মত হওয়ার খবর জানায়। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, মঙ্গলবার কাতারে পুনরায় এই আলোচনা শুরু হবে।
তবে ওই মার্কিন কর্মকর্তা মঙ্গলবারের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
গত রোববার ইরান হুশিয়ারি দেয়, কোনো জাহাজ তাদের নির্ধারণ করে দেওয়া পথ এড়িয়ে ভিন্ন পথে হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলে মধ্যপ্রাচ্যে ‘অস্থিরতা বাড়বে’।
হরমুজ প্রণালির ওমান ও ইরান, উভয়ের উপকূল দিয়ে বয়ে গেছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নীতি অনুযায়ী, উভয় দেশের কেউই এই পথ বন্ধ বা চলাচলের জন্য টোল আদায় করতে পারে না।
তেহরান বারবার হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যা সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।
সর্বশেষ রোববার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সেনা কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বারবার ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির’ কারণে ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালিয়েছে।
জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সেনাঘাঁটির বিরুদ্ধে হামলা চালায় ইরান। উভয় দেশ এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে তাদের উপকূলসংলগ্ন নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। তবে চলতি সপ্তাহে কয়েক ডজন জাহাজ প্রণালির বিপরীত পাশে ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যে ব্যবস্থায় প্রণালি পরিচালনা করছে, তার বাইরে নতুন বা ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। এতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে আরও দেরি হবে এবং উত্তেজনাও বাড়বে।’
সমঝোতা স্মারকের প্রকাশিত খসড়ায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে ওমান ও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করবে ইরান।
এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে তারা নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে। কেউ এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে আগের চেয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যত দিন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে, তত দিন এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের ‘আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন’ বাস্তবায়িত হবে না।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এ ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা সামনে আরও বাড়তে পারে।
লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ‘দীর্ঘায়িত আলোচনা এবং একই সঙ্গে প্রণালিতে নিয়ন্ত্রিত চাপ বজায় রাখার কৌশল ইরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।’
এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের এসব ঘটনার বেশির ভাগেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এলাকায় চলমান সামরিক অভিযানের সময় ছিটকে আসা গোলার ধাতব টুকরার আঘাতে একটি নৌকায় থাকা কাতারের এক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

