স্ক্রুর খাঁজ গুণে ক্যারিয়ার শুরু করে এখন অ্যাপলের সিইও, কে এই জন টার্নাস?

১৫ বছর ধরে অ্যাপলের নেতৃত্ব দিয়েছেন টিম কুক। এবার তার জায়গায় বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন এমন একজন, যাকে অ্যাপলের পণ্যপ্রেমীদের বাইরের কেউই খুব একটা চেনেন না। তিনি জন টার্নাস।

অ্যাপলের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা ৫১ বছর বয়সী টার্নাস মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়েছেন।

প্রযুক্তি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলে কুকের উত্তরসূরি হিসেবে তার নাম ঘোষণার পরই তাকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

কিন্তু টিম কুক অ্যাপল ছাড়ছেন না। তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

নেতৃত্বের এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে হলো, যখন অ্যাপলকে নতুন আইফোনের উন্মোচন সামলাতে হচ্ছে, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়েও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহেই নতুন আইফোন উন্মোচনের আয়োজন রয়েছে। শিগগিরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিল্ট-ইন ভার্চুয়াল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরি-র নতুন ও উন্নত ভার্সন চালুর পরিকল্পনাও করছে অ্যাপল। এটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির পেছনে থাকছে গুগলের জেমিনি।

টিম কুক তার শেষ কর্মদিবসে কর্মীদের উদ্দেশে লিখেছেন, জন টার্নাসের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে তিনি অত্যন্ত স্বস্তি বোধ করছেন। পৃথিবী বদলে দিতে পারে এমন পণ্য তৈরির জন্য কী প্রয়োজন, তা টার্নাসের মতো খুব কম মানুষই বোঝেন।

জন টার্নাসের বয়স এখন ৫১। তার জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়ই অ্যাপলের সঙ্গে কেটেছে।

২০০১ সালে অ্যাপলের পণ্য নকশা দলে যোগ দেন তিনি। কলেজ শেষ করার পর সেটিই ছিল তার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরিটি ছিল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি যন্ত্র তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ভার্চুয়াল রিসার্চ সিস্টেমসে।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে টার্নাস অ্যাপলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ২০২১ সালে তাকে হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়।

তিনি টিম কুকের চেয়ে বয়সে ১৫ বছরের ছোট। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যেসব শীর্ষ কর্মকর্তার নাম আগে আলোচনায় এসেছিল, তাদের মধ্যে টার্নাসই ছিলেন তুলনামূলকভাবে কম বয়সী।

অ্যাপলের নেতৃত্বের ইতিহাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি শতকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ছিলেন মাত্র দুজন, স্টিভ জবস ও টিম কুক। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, এমন কাউকেই অ্যাপল বেছে নিতে চেয়েছে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল।

টার্নাস এত দিন সরাসরি কুকের অধীনে কাজ করেছেন এবং তাকে নিজের পরামর্শদাতা হিসেবেও দেখেন। অ্যাপলের পুরো হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। আইফোন ও ম্যাকবুকের মতো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর কথা বিবেচনায় নিলে তার আগের দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝা যায় সহজেই।

অ্যাপলে টার্নাসের শুরুর দিকের একটি কাজ ছিল অ্যাপল সিনেমা ডিসপ্লের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা।

২০২৪ সালে নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার প্রকৌশল বিভাগের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে সেই সময়ের একটি ঘটনা বলেছিলেন তিনি।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অ্যাপলে যোগ দেওয়ার প্রথম বছরেই এক সরবরাহকারীর কারখানায় গিয়ে রাত পেরিয়ে স্ক্রুর মাথায় থাকা খাঁজ গুনছিলেন টার্নাস। সেখানে তিনি দেখতে পান, একটি যন্ত্রাংশে ৩৫টি খাঁজ রয়েছে, অথচ থাকার কথা ২৫টি।

সেই মুহূর্তে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি আসলে কী করছেন এবং এটি স্বাভাবিক কি না। ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে অবশ্য এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি তার মনোযোগই অ্যাপলের কাজের দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।

টার্নাস তার সমাবর্তন বক্তব্যে বলেছিলেন, ঘরে থাকা অন্য সবার মতো নিজেকেও বুদ্ধিমান ভাবতে হবে, তবে কখনোই মনে করা যাবে না যে অন্যদের চেয়ে বেশি জানা আছে। তার মতে, এই মানসিকতা আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি প্রশ্ন করার মতো বিনয়ও তৈরি করে।

অ্যাপলের ভেতরে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে টার্নাসের দায়িত্বও বেড়েছে।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপলের হার্ডওয়্যার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি এয়ারপডস, অ্যাপল ওয়াচ এবং ভিশন প্রোর মতো পণ্যের বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

অ্যাপলের ইন্টেল চিপ থেকে নিজেদের তৈরি অ্যাপল সিলিকন চিপে যাওয়ার বড় পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপলের তুলনামূলক কম দামের ল্যাপটপ ম্যাকবুক নিও তৈরির সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। খরচ কমাতে এই ল্যাপটপে কিছু হার্ডওয়্যারগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে আইফোনে ব্যবহৃত চিপও ব্যবহার করা হয়েছে।

ম্যাকবুক নিও নিয়ে টমস গাইডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টার্নাস বলেন, অ্যাপল কখনো নিম্নমানের পণ্য বাজারে আনতে চায় না। নিও তৈরির জন্য তাই নতুন করে সবকিছু গড়ে তুলতে হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাপল সিলিকন এবং ম্যাক, আইফোন ও আইপ্যাড তৈরির বহু বছরের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো হয়েছে।

স্টিভ জবসের সঙ্গে কাজের সময়কার একটি স্মৃতিও টার্নাসের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, জবসের কারুশিল্প এবং খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোযোগের কথা মনে করেছিলেন টার্নাস। একবার একটি আসবাবের পেছনের দিকও সামনে অংশের মতোই সুন্দরভাবে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা জবস খেয়াল করেছিলেন। অথচ সেটি সাধারণত কারও দেখার কথা নয়।

টার্নাসের কাছে ঘটনাটি অ্যাপলের কাজের ধরনকে বোঝানোর একটি দারুণ উদাহরণ। ব্যবহারকারী কোনো অংশ দেখবেন কি না, সেটি বড় বিষয় নয়, পণ্য তৈরির প্রতিটি জায়গায় মান বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সেই দর্শন ধরে রাখতে পারেন কি না, সেটিও হবে টার্নাসের বড় পরীক্ষা।

নতুন দায়িত্বে টার্নাসকে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে অ্যাপলের পিছিয়ে পড়া অবস্থান কাটিয়ে ওঠা।

একইসঙ্গে ভিশন প্রোর পেছনে থাকা প্রযুক্তি নিয়ে অ্যাপল কী করবে, সেটিও তাকে ঠিক করতে হবে।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপলের নতুন সিরি ব্যবস্থায় গুগলের জেমিনি ব্যবহার করার ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ কৌশল টার্নাসের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

অ্যাপলের বাইরে টার্নাসের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁতার দলের সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের প্রকল্প হিসেবে তিনি এমন একটি খাবার খাওয়ানোর যন্ত্র তৈরি করেন, যা চার হাত-পা অচল ব্যক্তিরাও মাথা নেড়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন।

টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকাশ্য রাজনৈতিক অনুদানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে টার্নাস ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর চাক শুমারকে ২ হাজার ৯০০ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন।

এর বাইরে এত দিন তিনি অনেকটাই আড়ালে ছিলেন। এমনকি টেক ক্রাঞ্চের ভাষ্য, সম্প্রতি তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) যোগ দিতে চেয়েছিলেন। তবে সুযোগ এখন আর নেই।

এখন দেখার বিষয়, হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে সাফল্যের পর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারেন।

Related Articles

Latest Posts