মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ যখন ক্রমেই স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে, তখন শ্রীমঙ্গলে দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র। টিফিনের বিরতিতে মোবাইলের পর্দায় নয়, শিক্ষার্থীদের কেউ ডুবে আছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’, কেউ জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’, আবার কেউ পড়ছে জুল ভার্নের ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’।
স্মার্ট ফোন থেকে দূরে রেখে শিক্ষার্থীদের বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন এই উদ্যোগ নিয়েছে। ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত ‘শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব-২০২৬’ এখন উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, ইতিহাস ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতেই এই উৎসবের আয়োজন। এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে ‘শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব’ এবং ‘উত্তরণ’।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এই উৎসবে বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের ১৪টি বই নির্বাচন করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের ‘আবিষ্কারের নেশায়’, ড. এ পি জে আবদুল কালামের ‘উইংস অব ফায়ার’, শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’, জুল ভার্নের ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’, হুমায়ুন আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলী’, জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’, মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাত শ দিন’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘মরু-ভাস্কর’ ও ‘মৃত্যুক্ষুধা’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাশিয়ার চিঠি’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’, জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’, আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’। এ ছাড়া উন্মুক্ত বিভাগের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’।
এই বইগুলো পড়ে শিক্ষার্থীরা তিন ধাপের একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। প্রথম ধাপের নাম ‘মুকুল পর্ব’। এই পর্বে উপজেলার ৩৮টি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।
সম্প্রতি এই ‘মুকুল পর্বের’ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই পর্বে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আগামী ৩০ ও ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় ধাপ বা ‘ফুল পর্ব’।
সব শেষে প্রতিটি শ্রেণির সেরা তিনজনকে নিয়ে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর উপজেলা পর্যায়ে ‘ফল পর্ব’ অনুষ্ঠিত হবে। চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ীদের জন্য ল্যাপটপ, বই, ক্রেস্টসহ বিভিন্ন পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বইপড়া উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক দেবাশীষ দাশ বলেন, ‘মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে আমাদের এই আয়োজন। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন বই পড়ুক। এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।’
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান বলে, ‘বইপড়া উৎসবে আমাদের জন্য “বিলেতে সাড়ে সাত শ দিন” বইটি নির্ধারণ করা হয়েছে। বইটি পড়ে আগের দিনের ইংল্যান্ডের সমাজ, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পেরেছি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। তরুণদের বড় একটি অংশ এখন স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমরা চাই তারা আবার বইয়ের জগতে ফিরে আসুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি-দুটি বই হয়তো কাউকে বদলে দেবে না, কিন্তু নিয়মিত পড়ার অভ্যাস একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে। আমরা শ্রীমঙ্গলে বই পড়াকে একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে চাই।’

