সৌদিতে কারখানায় আগুন: মায়ের সঙ্গে শেষ কথাটুকুও বলতে পারেননি মোহন

‘কেন ফোন ধরছ না? আর তো আমাকে পাবে না। দুটো কথা বলব, আর বলব না। আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি।’

দ্য ডেইলি স্টারের কাছে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে ছেলের সেই বার্তাটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন মা ময়না বেগম।

মায়ের কাছে এটাই ছিল মোহন প্রামাণিকের শেষ বার্তা। সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগার মুহূর্তে মাকে পাঠানো সেই ভয়েস বার্তাই এখন নওগাঁর আত্রাইয়ের গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না বেগমের কাছে ছেলের শেষ স্মৃতি।

শুধু মোহন নন, ওই অগ্নিকাণ্ডে তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিকও মারা গেছেন।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের গণ্ডগোহালী গ্রামের গফফার প্রামাণিকের স্ত্রী ময়না বেগম রোববার সৌদির ওই অগ্নিকাণ্ডে হারিয়েছেন তার দুই সন্তানকেই।

ময়না বেগম বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও ওয়াইফাই না থাকায় ছেলের শেষ কথাগুলো সরাসরি শুনতে পারিনি। তার আগেই আগুন কেড়ে নেয় মোহনকে।’

পরিবারের অভাব ঘোচাতে দুই ভাই পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। ঋণের বোঝা কমিয়ে দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। সেই স্বপ্নের সঙ্গে পুড়ে গেছে একটি পরিবারের সব আশা।

এর আগে, দুর্ঘটনার দিন সকালে ছোট ছেলে ফোন করে আগের দিন কারো সঙ্গে হওয়া এক বাগবিতণ্ডার কথা জানিয়েছিলেন মাকে।

ময়না বেগম জানান, সাত বছর আগে দালালের খপ্পরে পড়ে সঠিক ভিসা ছাড়া সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মোহন। সেখানে বেশ কিছু দিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল তাকে। পরে ১২ লাখ টাকা ঋণ করে একটি ছোট ব্যবসা দাড় করান।

মায়ের ভাষ্য, ‘বিদেশে যাওয়ার সময় চার লাখ টাকা সুদে ঋণ নিয়েছিলাম, যা চক্রবৃদ্ধি সুদে বেড়ে আট লাখ টাকা হয়। মোহন কষ্ট করে চার লাখ টাকা শোধ করেছিল। দুই বছর আগে ছোট ছেলেও ভাইয়ের কাছে যায়। দুজনে মিলে বাকি ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিগগিরই দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল মোহনের। কিন্তু এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল। আমি আমার ছেলেদের হারিয়েছি। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে… আমার ছেলেদের লাশ অন্তত আমার বুকে ফিরিয়ে এনে দিন।’

দুই ছেলের উপার্জনের ওপর ভরসা করেই কাঁচা ঘরটি পাকা করার কাজ ধরেছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্নও আর পূরণ হবে না।

গণ্ডগোহালী গ্রাম থেকে শুধু এই দুই ভাই নন, ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন আরও দুই যুবক। তারা হলেন সাইদুর রহমানের ছেলে মো. রুবেল প্রামাণিক এবং মৃত বজলুর রহমানের ছেলে মো. কলিম উদ্দিন।

সরেজমিনে জানা যায়, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রুবেলের স্ত্রী সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তবে নবজাতক সন্তানকে একটিবারের জন্যও বুকে জড়িয়ে নিতে পারলেন না বাবা রুবেল। 

কান্না ও শোকে ভেঙে পড়েছেন রুবেলের স্ত্রী আঁখি খাতুন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমার বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে, আর আমার এই ছোট বাচ্চাটা কোনো দিন বাবার ছোঁয়া পাবে না?’

রুবেলের বাবা সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি ছেলেকে হারালাম, পরিবার হারাল তার একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে। আমার আর কিছু বলার নেই। শুধু ছেলের লাশটা দ্রুত দেশে ফেরত চাই।’

নিহত কলিম উদ্দিনের মা করিমা বেগমের পরিবারে আর কেউ অবশিষ্ট নেই।

তিনি বলেন, ‘অনেক বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছি, এবার হারিয়ে ফেললাম একমাত্র সম্বল এই ছেলেকে। এখন আর আমার দেখার মতো কেউ রইল না।’

এদিকে সৌদির ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর আসার পর গণ্ডগোহালী গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ইদ্রিস হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একই গ্রামের চারজন তরুণের এমন মৃত্যু পুরো এলাকা স্তব্ধ করে দিয়েছে। নিহতরা সবাই ছিলেন তাদের পরিবারের মূল চালিকাশক্তি। খবর পাওয়ার পর থেকেই গ্রামবাসী ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা নিহতের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানাচ্ছেন।’

আত্রাইয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সৌদি আরবের ওই কারখানায় আগুনে পুড়ে আত্রাই উপজেলার মোট ১৩ জন বাসিন্দা নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার মতো নয়।’

Related Articles

Latest Posts