সব চোখ পাকিস্তানে

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, প্রত্যাশা এবং একইসঙ্গে শঙ্কা।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের বিস্তার ঘটে। এই সংঘাতে ইতোমধ্যে বহু দেশে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে।

এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত এই প্রণালিতে চলাচল সীমিত করে দেয়, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতি ছিল ভঙ্গুর। উভয় পক্ষের শর্ত ব্যাখ্যায় পার্থক্য, পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলের নতুন করে হামলা, সব মিলিয়ে এই সমঝোতা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

ইসলামাবাদে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক

শনিবার থেকে ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে এই বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ উভয় পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর পরই এই বৈঠকের পথ প্রশস্ত হয়। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, স্থানীয় সময় শনিবার সকাল থেকেই আলোচনা শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

তবে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কোনো প্রতিনিধি আলোচনায় থাকবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে বাড়তি কৌতূহল তৈরি করেছে।

যেভাবে চলবে আলোচনা?

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে অবস্থান করবেন এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন।

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন। বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পৃথকভাবে দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলেও জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ্ধতি সাধারণত তখনই ব্যবহৃত হয় যখন দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থা অত্যন্ত কম থাকে, যা এই সংঘাতের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।

উচ্চ নিরাপত্তায় ইসলামাবাদ

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন জানাচ্ছে, এই বৈঠককে ঘিরে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ‘রেড জোন’ সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও বিদেশি দূতাবাস অবস্থিত।

১০ হাজারেরও বেশি পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়েছে।

বৈঠকের ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেল, যা ইতোমধ্যে খালি করে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিও এই বৈঠকের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে তুলে ধরছে।

আলোচনার মূল এজেন্ডা কী?

এই বৈঠকে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা, সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খোঁজা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে পারে।

বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, সামরিক হামলা বন্ধ রাখা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আস্থার সংকট কমানো, এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ কোথায়?

যদিও এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদ রয়েছে, তবে বড় চ্যালেঞ্জও কম নয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আলোচনার মধ্যেই সংঘাত তীব্র হওয়ার নজির রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, আগের আলোচনার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে, যা তাদের আস্থার ঘাটতি বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের আঞ্চলিক তৎপরতা এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

বিশ্বের দৃষ্টি এখন ইসলামাবাদে

সব মিলিয়ে এই আলোচনা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে।

একটি সফল সমঝোতা যেমন যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে পারে, তেমনি ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এই অনিশ্চয়তার মাঝেই বলা হচ্ছে, এ মুহূর্তে সত্যিই ‘সব চোখ পাকিস্তানে’।

Related Articles

Latest Posts