শুরু হয়ে গেছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬। আপনি বিশ্বকাপের খেলাগুলো দেখতে চাইছেন, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে সময়টা ম্যানেজ করবেন। কারণ ম্যাচ দেখতে গেলেই রাতের ঘুমের সঙ্গে রীতিমতো একটি যুদ্ধ বেঁধে যাবে।
যদি সকালে অফিস বা ক্লাস থাকে, তাহলে ম্যাচগুলো দেখা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়বে। আর শিশুরাও যদি রাতের বেলা আপনার খেলা দেখার সঙ্গী হয়ে ওঠে, তাহলে তারা পরদিন সকালে ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
তবে এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কারণ আজ আমরা আলোচনা করব কিছু সহজ পরিকল্পনার নিয়ে, যা আপনাকে রাত জাগা বা পরের দিনের ক্লান্তি ছাড়াই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করতে সাহায্য করবে।
কীভাবে ভালোভাবে ঘুমানো যাবে, কফি পানের সর্বোত্তম সময় কখন এবং শিশুদের বিষয়টি কীভাবে ম্যানেজ করবেন—এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
তবে হ্যাঁ, একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সবগুলো ম্যাচ দেখা কিন্তু সহজ হবে না। কারণ মোট ১০৪টি ম্যাচ বিকেল ৫টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। এমনকি কিছু ম্যাচ গভীর রাতেও শুরু হবে।
ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ঘুম বিশেষজ্ঞ প্রফেসর রাসেল ফস্টার বলেন, ‘বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর সময়সূচি মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন না। কারণ খেলা দেখার উত্তেজনার রেশ আপনার মনে থেকে যাবে, যা আপনাকে জাগ্রত রাখবে। এ অবস্থায় ঘুমানো সহজ নয়।’
কিছু ম্যাচ দেখা সহজ হবে, আবার কিছু ম্যাচ ঘুমের কারণে দেখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই প্রথমেই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনি কখন ঘুমাতে চান। বিশেষজ্ঞরা এক্ষেত্রে তিন ধরনের ঘুমের কৌশলের পরামর্শ দিয়েছেন।
দ্য ফুল আমেরিকান
এই কৌশলটি তাদের জন্য, যারা ফুটবলের ‘ডাই-হার্ড ফ্যান’ এবং যাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।
এই পদ্ধতিটি মূলত তাদের জন্য, যারা বিশ্বকাপ চলাকালে নর্থ আমেরিকান টাইম জোনে বসবাস করবেন। তারা রাত জেগে খেলা দেখবেন এবং দিনের বেলায় ঘুমাবেন। কয়েক দিন পরই আপনার শরীর এই অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেবে। এর ফলে আপনি প্রায় প্রতিটি ম্যাচই দেখতে পারবেন।
তবে এর একটি অসুবিধাও রয়েছে। এই সময়টায় আপনি পরিবার ও বন্ধুদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন না। পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও সময়ের স্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
দ্য স্যান্ডউইচ
এই পরিকল্পনায় দুই ধাপে ঘুমানোর অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। ম্যাচ শুরুর আগেই অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতে যেতে হবে এবং ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে। খেলা দেখা শেষে আবার ঘুমিয়ে পড়তে হবে।
তবে এই পরিকল্পনা অনুসরণ করলে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছুটা ঝিমুনি অনুভব করতে পারেন। আবার ম্যাচ শেষে সমর্থন করা দলের জয় বা পরাজয়ের আনন্দ কিংবা হতাশার কারণে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়াও কঠিন হতে পারে।
দ্য স্কুইজ
এটি খুবই সাধারণ একটি পদ্ধতি। এতে ম্যাচ দেখার জন্য আপনাকে জেগে থাকতে হবে এবং অফিস, ক্লাস বা অন্যান্য কাজ শুরুর আগে যে সময়টুকু পাওয়া যাবে, তার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে হবে।
এই তিনটির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে ভালো?
এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। এটি মূলত নির্ভর করে একজন মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের অভ্যাসের ওপর। যারা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে অভ্যস্ত, তারা হয়তো এক ধরনের কৌশল অনুসরণ করবেন। আবার যারা রাত জাগতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তারা হয়তো নিজেদের সুবিধামতো অন্য কোনো স্ট্র্যাটেজি বেছে নেবেন।
আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হবে সেটিই, যেটি অনুসরণ করে আপনি ফুটবল ম্যাচগুলো আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতে পারবেন এবং একইসঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুমও নিশ্চিত করতে পারবেন।
রাতে ফুটবল ম্যাচ দেখার কারণে হয়তো আপনার পর্যাপ্ত ঘুম হবে না। তাই দিনের বেলা ক্লান্তিবোধ করলে, ক্লান্তি দূর করার জন্য সাধারণত যা করেন, সেসবের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আপনি যদি অ্যালকোহল সেবন করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অ্যালকোহলের কারণে হয়তো ঘুমঘুম ভাব আসবে, কিন্তু এর ফলে ভালো ঘুম হয় না।
প্রশ্ন জাগতে পারে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের শরীরে কী ঘটতে পারে? ঘুমের অভাবে খুব সহজেই মুড সুইং হতে পারে এবং ছোট ছোট বিষয়েও বিরক্তি কাজ করতে পারে। অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাবধানতা দেখা দিতে পারে। মন-মেজাজ খিটখিটে থাকার কারণে অনেক সময় অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করার সম্ভাবনাও থাকে।
কাজের ক্ষেত্রে মনোযোগ ও একাগ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং কর্মদক্ষতাতে চোখে পড়ার মতো অবনতি দেখা দিতে পারে।
অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাব বেশ গুরুতর হতে পারে। ঘুমের অভাবে সৃষ্ট ক্লান্তির কারণে গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ঘুমের এসব কৌশল অনুসরণ করার আগে বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত। শুধু তা-ই নয়, এ ধরনের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং গুরুতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করা থেকেও বিরত থাকাই শ্রেয়।
ফুটবল টুর্নামেন্ট চলাকালে অনেকেই রাত জেগে থাকার জন্য ক্যাফেইন গ্রহণের পথ বেছে নিতে পারেন। কফি, চা এবং বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকে ক্যাফেইন পাওয়া যায়।
ব্রেনের যে সিগন্যালগুলো ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে, ক্যাফেইন সেগুলোকে ব্লক করে দেয় এবং আমাদের জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ক্যাফেইন দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে থেকে যায়। ফলে কড়া লিকারের চা বা কফি পান করে রাত জেগে ম্যাচ দেখার পর ঘুমাতে গেলে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে।
সাধারণত রাতে ভালো ঘুমের জন্য দুপুরের পর কফি না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বিশ্বকাপ চলাকালীন এই সময়টার জন্য শুধু কিছুটা মানিয়ে নেওয়া যেতেই পারে।
রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখলেও প্রতিদিন সকালে যে সময়ে আপনি সাধারণত ঘুম থেকে ওঠেন, সম্ভব হলে সেই সময়েই ঘুম থেকে ওঠা উচিত। এর ফলে শরীরের স্লিপ প্যাটার্ন বজায় থাকে। সকালের সূর্যের আলো আমাদের ব্রেনকে সজাগ থাকতে সাহায্য করে।
রাত জেগে ম্যাচ দেখার পর ঘুমের ঘাটতি পূরণের জন্য দিনের বেলা মাঝে মাঝে শর্ট ন্যাপ নেওয়া যেতে পারে। শর্ট ন্যাপ নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো দুপুরের খাবারের পর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি শর্ট ন্যাপ নেওয়া উচিত নয়। কারণ এর চেয়ে বেশি সময় ঘুমালে মানুষ গভীর ঘুমে চলে যেতে পারে। তখন ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
ছোট শিশুদের রাতে যথাসময়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া উচিত। খেলা চলাকালে যদি তারা ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে ম্যাচ দেখার জন্য তাদের না জাগানোই ভালো।
কিশোর-কিশোরীরা চাইলে রাত জেগে ফুটবল ম্যাচ দেখতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে পরদিন সকালে স্কুলের জন্য ঘুম থেকে ওঠা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং ক্লাস চলাকালে তারা ক্লান্তিবোধ করতে পারে।
তারা হয়তো বিষয়টি পছন্দ করবে না, কিন্তু চাইলে দিনের বেলা পুরো ম্যাচের রিপ্লে বা হাইলাইটস দেখে নিতে পারে।

