আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলা হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে। কিন্তু এই পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে এমন কিছু প্রথা বা ঐতিহ্য যুগের পর যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে বেশ অদ্ভুত এবং নাটকীয় মনে হতে পারে।
এমনই একটি রোমাঞ্চকর এবং চমকপ্রদ প্রথা হলো ‘স্টেট ওপেনিং অব পার্লামেন্ট’ বা পার্লামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ রাজার একজন বিশেষ প্রতিনিধির মুখের ওপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দেওয়া।
এই বিশেষ কর্মকর্তার পদবি হলো ‘ব্ল্যাক রড’।
প্রশ্ন হলো, কেন একজন সম্মানিত রাজকীয় কর্মকর্তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়?
এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাজা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ৩৮৪ বছরের এক রক্তাক্ত ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
‘ব্ল্যাক রড’ পদটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ‘হাউস অব লর্ডসের’ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও প্রবীণ একটি পদ। ইউকে পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই পদের আনুষ্ঠানিক নাম হলো ‘জেন্টলম্যান আশার অব দ্য ব্ল্যাক রড’ অথবা নারী হলে ‘লেডি আশার অব দ্য ব্ল্যাক রড’। পদটি প্রথম চালু হয়েছিল ১৩৫০ সালে। অর্থাৎ এটি ৬৬৫ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহ্য।
‘ব্ল্যাক রড’ নামটি এসেছে এই কর্মকর্তার হাতে থাকা পদমর্যাদার প্রতীকী দণ্ডটি থেকে। এটি আবলুস কাঠের তৈরি একটি কালো রঙের ছড়ি বা দণ্ড। এটির মাথায় একটি সোনালি রঙের সিংহ বসানো থাকে।
ব্ল্যাক রড হলেন উচ্চকক্ষে ব্রিটিশ রাজশাসকের (রাজা বা রানি) ব্যক্তিগত পরিচারক বা প্রতিনিধি এবং তিনি সেখানে ‘সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সারাহ ক্লার্ক লেডি আশার অব দ্য ব্ল্যাক রড হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন এই পদের প্রায় সাড়ে ৬০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী।
বর্তমানে এই পদে রয়েছেন এড ডেভিস। তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন ব্ল্যাক রড হিসেবে নিয়োগ পান এবং ওই বছরের জুলাইয়ে তার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৬৬৫ বছরের ইতিহাসে তিনি হলেন ৬২তম ব্ল্যাক রড।
ব্ল্যাক রডের সবচেয়ে পরিচিত এবং আকর্ষণীয় দায়িত্বটি পালন করতে হয় পার্লামেন্টের উদ্বোধনী দিনে। এই দিন ব্ল্যাক রডকে হাউস অব লর্ডস থেকে নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্সে’ পাঠানো হয় সংসদ সদস্যদের (এমপিদের) ডেকে আনার জন্য। এই ডাকের পর তারা উচ্চকক্ষে গিয়ে রাজার ভাষণ শুনতে পারেন।
ব্ল্যাক রড যখন হাউস অব কমন্সের দরজার কাছে পৌঁছান, ঠিক তখনই তার মুখের ওপর সজোরে দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি কোনো অপমান নয়, বরং এটি হাউস অব কমন্সের স্বাধীনতার এক চিরন্তন প্রতীক।
হাউস অব লর্ডসের প্রকাশিত এক ভিডিওতে বর্তমান ব্ল্যাক রড এড ডেভিস বলেন, এই প্রথার পেছনের ইতিহাস ৩৮৪ বছর আগের। ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডে যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তখন রাজা প্রথম চার্লস তার সেনাবাহিনী নিয়ে হাউস অব কমন্সে প্রবেশ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল জন হ্যাম্পডেন, জন পিম এবং আরও তিনজন সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা। কিন্তু রাজার এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পর থেকে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কাছে নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা প্রমাণের জন্য এই দরজা বন্ধ করার প্রথা চালু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত, ব্রিটেনের রাজা বা তার কোনো প্রতিনিধি বিনা আমন্ত্রণে হাউস অব কমন্সে প্রবেশ করতে পারেন না। দরজা বন্ধ হওয়ার পর, ব্ল্যাক রড তার হাতের কালো দণ্ডটি দিয়ে দরজায় পরপর তিনবার সজোরে আঘাত করেন বা কড়া নাড়েন। এরপর ভেতর থেকে তাকে চিনে নেওয়ার পর দরজা খুলে দেওয়া হয়।
তিনি ভেতরে প্রবেশ করে রাজার পক্ষে হাউস অব কমন্সের সদস্যদের হাউস অব লর্ডসে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। এরপর এমপিরা উচ্চস্বরে কথা বলতে বলতে ব্ল্যাক রডের পিছু পিছু হাউস অব লর্ডসের দিকে এগিয়ে যান।
ব্রিটিশ সরকার ব্যবস্থার দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার উচ্চকক্ষ হলো হাউস অব লর্ডস। এর উৎপত্তি হয়েছিল ১১শ শতকে এবং ১৩শ ও ১৪শ শতকে এটি পার্লামেন্টের একটি স্বতন্ত্র অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৬৭০-এর বেশি বলে জানায় হাউস অব লর্ডসের ওয়েবসাইট।
ব্ল্যাক রড এই লর্ডস চেম্বারেই তার দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মানুষের কাছে ব্ল্যাক রডকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক চরিত্র মনে হলেও, বাস্তবে তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
এড ডেভিসের মতে এবং পার্লামেন্টের নথি অনুযায়ী, ব্ল্যাক রডের দায়িত্ব মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত: প্রশাসনিক এবং আনুষ্ঠানিক।
দৈনন্দিন ভিত্তিতে ব্ল্যাক রড হাউস অব লর্ডসের প্রবেশাধিকার, শৃঙ্খলা এবং সদস্যদের আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণ করেন। সামন্ততান্ত্রিক ইংল্যান্ডে ‘সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস’ ছিলেন লর্ডদের সশস্ত্র রক্ষী, যিনি রাজদ্রোহীদের গ্রেপ্তার করতেন। কিন্তু বর্তমানে এই পদটি আইনি বা সংসদীয় সংস্থায় আনুষ্ঠানিক ও শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিযুক্ত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংসদীয় কার্যপ্রণালীর মূল লক্ষ্য হলো সভার শিষ্টাচার বা ডেকোরাম বজায় রাখা। আর ব্ল্যাক রড উচ্চকক্ষে এই শিষ্টাচার নিশ্চিত করেন।
তিনি ‘লর্ড গ্রেট চেম্বারলেইনের’ সচিব হিসেবে প্যালেস অব ওয়েস্টমিনস্টারেও অনুষ্ঠিত প্রধান আনুষ্ঠানিক ইভেন্টগুলোর পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ করেন।
প্যালেস অব ওয়েস্টমিনস্টারে অবস্থিত ‘রোবিং রুম’ এবং ‘রয়্যাল গ্যালারির’ মতো রাজার অবশিষ্ট সম্পত্তির দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত থাকে।
পার্লামেন্ট এস্টেট জুড়ে হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডসের সার্বিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে তিনি সহায়তা করেন।
এছাড়া পদাধিকারবলে তিনি ‘অর্ডার অব দ্য গার্টারের’ একজন কর্মকর্তা।
ব্ল্যাক রড এই বিশাল কর্মযজ্ঞ একা পরিচালনা করেন না। ব্ল্যাক রডের অধীনে ৩০ সদস্যের একটি দল রয়েছে। এই দলের একটি বড় অংশই হলেন হাউস অব লর্ডসের ‘ডোরকিপার’ বা দারোয়ান। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন এবং পার্লামেন্টের উদ্বোধনী আয়োজনের মতো ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানগুলোর একেবারে কেন্দ্রে থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যকার ভারসাম্য কীভাবে ঐতিহ্যের মোড়কে আজও টিকে আছে, ব্ল্যাক রডের দায়িত্ব পালন তারই এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত।

