মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা জানাল রয়টার্স

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুতর শারীরিক আঘাত পাওয়ার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানিয়েছে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনির মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে এবং তার পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তার ঘনিষ্ঠ অন্তত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে চালানো বিমান হামলায় তিনি আহত হন। যদিও তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি ইরান, তবুও ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ৫৬ বছর বয়সী এই নেতা ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন এবং মানসিকভাবে সচল রয়েছেন। বর্তমানে তিনি অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন এবং যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যুক্ত আছেন।

তবে তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের রাজধানীতে, আর সেই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতার কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

মোজতবা খামেনির অবস্থান ও শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে জনসমক্ষে খুব কম তথ্যই রয়েছে। হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করা হয়নি, যা জনমনে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাকে ‘জানবাজ’, অর্থাৎ যুদ্ধে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত একটি শব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও মার্চে মন্তব্য করেছিলেন, খামেনি আহত হয়েছেন এবং তার চেহারা বিকৃত হয়ে থাকতে পারে। এমনকি একটি মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি হয়তো একটি পা হারিয়েছেন, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনি তার বাবার মতো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠতে সময় নেবেন। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, তিনি ধারাবাহিকতার প্রতীক হলেও তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য কঠিন হবে। তার মতে, ‘তিনি অনেকগুলো কণ্ঠের একজন হবেন, একক সিদ্ধান্তদাতা নন।’

ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার হাতে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা থাকে, তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তত্ত্বাবধান করেন এবং সরাসরি বিপ্লবী গার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের মতে, যুদ্ধ চলাকালে আইআরজিসি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তে তাদের ভূমিকা বেড়েছে।

মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি ইরানের ভেতরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘কোথায় মোজতবা?’, এমন স্লোগানসহ নানা মিম ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের প্রতিফলন। তবে সরকারপন্থীরা বলছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণেই তাকে জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইতোমধ্যে দেশের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে গুরুতর শারীরিক আঘাত নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা। তার শারীরিক অবস্থা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা আগামী দিনগুলোতে ইরানের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Related Articles

Latest Posts