শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই যেন থেমে গেল আর্জেন্টিনার লাখো সমর্থকের হৃদস্পন্দন। স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শিরোপা হাতছাড়া করেছে আলবিসেলেস্তেরা। তবে পরাজয়ের কষ্টের চেয়েও বেশি যেটি পোড়াচ্ছে সমর্থকদের, সেটি হলো, এটাই হয়তো লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাই নিউ জার্সির ফাইনালের হার শুধু একটি ট্রফি হারানোর নয়, একটি যুগের অবসানের বেদনাও হয়ে উঠেছে।
বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক কেন্দ্রের ক্যাফে, শহরের চত্বর কিংবা রাস্তাঘাট, বিশ্বকাপ ফাইনাল শুরুর আগে সর্বত্র ছিল উৎসবের আবহ। নীল-সাদা পতাকা গায়ে জড়িয়ে, জাতীয় দলের জার্সি পরে হাজারো সমর্থক বিশ্বাস করেছিলেন, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আরেকটি অলৌকিক প্রত্যাবর্তন দেখবেন তারা।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেওয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। উল্লাসের জায়গা দখল করে নেয় নীরবতা, কান্না আর হতাশা।
২২ বছর বয়সী স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী কামিলো সিচেরো চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমার ভেতরটা একদম শূন্য লাগছে। ট্রফির জন্য নয়, মেসির জন্য। কারণ বিশ্বকাপে তাকে আর কখনো দেখতে পাব না। এটাই ছিল শেষ।’
পাশেই কান্নায় ভেঙে পড়া বন্ধুকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তার বন্ধু, আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হুয়ান সাএন্স, ‘এটাই ছিল মেসির শেষ। একটা যুগের শেষ। আমি জন্ম থেকেই তাকে খেলতে দেখেছি, আজ সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।’
তবে হতাশার মাঝেও অনেক সমর্থক শান্তি খুঁজে নিয়েছেন এই ভেবে যে, মেসি এরই মধ্যে ফুটবলে জেতার মতো সব শিরোপাই জিতেছেন। কামিলো বলেন, ‘অন্তত এটুকু ভেবে শান্তি পাই যে, সে ইতোমধ্যেই সবকিছু জিতেছে।’
ম্যাচের শুরুতে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। টুর্নামেন্টজুড়ে সংকট কাটিয়ে ওঠা দলের ওপর ছিল অগাধ আস্থা। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে উৎকণ্ঠা।
এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখার পর এক নারী সমর্থক চিৎকার করে ওঠেন, ‘না, না… এটা হতে পারে না! প্লিজ!’
৮৭ বছর বয়সী তেরেসা দোলোরেস দেল রিও ভারেলা অতিরিক্ত সময় শুরুর আগে বলেন, ‘ম্যাচটা যেন শেষই হচ্ছে না। যত সময় যাচ্ছে, ততই স্নায়ুচাপ বাড়ছে।’
শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোল আর্জেন্টিনার সব আশা শেষ করে দেয়। ক্যাফেজুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা। তবুও শেষ বাঁশির পর নিজেদের দলকে করতালি দিয়ে সম্মান জানাতে ভোলেননি সমর্থকেরা।
যদিও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন কামিলো, ‘আর্জেন্টিনার খেলা আমার ভালো লাগেনি। কৌশল ভালো লাগেনি, বদলিগুলোও না। এমনকি রেফারিংও ভালো লাগেনি।’
৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আবেল তোরেস, যিনি পুরো ম্যাচজুড়ে ভুভুজেলা বাজিয়েছেন, চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘আর্জেন্টিনা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে। আজকের ম্যাচটা দেখিয়ে দিল আমরা কেমন জাতি। যত বাধাই আসুক, আমরা আবার উঠে দাঁড়াই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এবার বিশ্বকাপ আমাদের হয়নি। কিন্তু এই দল আমাদের শিখিয়েছে, কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না।’
হারের পরও বুয়েনস আইরেসে আতশবাজি ফুটেছে, গাড়ির হর্ন বেজেছে। হাজারো সমর্থক ছুটে গেছেন শহরের প্রতীকী ওবেলিস্কে। অনেকেই জানিয়েছেন, দেশে ফিরলে পরাজিত হলেও মেসিদের বীরের সম্মানেই বরণ করে নেবেন।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেও সামাজিক মাধ্যমে দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ খেলোয়াড়রা! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছ। আর্জেন্টিনা সবসময় মাথা উঁচু করেই থাকবে।’

