জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় কিছুটা কমানো হয়েছে। আগের প্রস্তাবের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমিয়ে নতুন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে এই ব্যয় চূড়ান্ত করা হয়। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) শুরুতে এই দুই প্রকল্পের জন্য সম্মিলিতভাবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার সংশোধিত ব্যয়ের প্রস্তাব করেছিল।
সরকারের নির্দেশনা সাপেক্ষে আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়, অথবা এর পরের কোনো সভায় এই প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট) এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
কোন পথে যাবে নতুন দুই মেট্রোরেল লাইন
এমআরটি লাইন-১ এর মোট দৈর্ঘ্য হবে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। এই রুটটি দুটি অংশে বিভক্ত থাকবে। একটি অংশ হবে পাতাল রেল এবং অপরটি উড়ালপথ। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটারের পাতাল রেল অংশে মোট ১২টি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থাকবে। এগুলো হলো—এয়ারপোর্ট, এয়ারপোর্ট টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, নদ্দা, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, আফতাবনগর, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।
অন্যদিকে নতুনবাজার থেকে শুরু হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটারের উড়ালপথে মোট ৭টি এলিভেটেড স্টেশন থাকবে। স্টেশনগুলো হলো—জোয়ারসাহারা, বোয়ালিয়া, মোস্তুল, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল ইস্ট ও পূর্বাচল টার্মিনাল।
এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট) সাভারের হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে পাতাল (আন্ডারগ্রাউন্ড) ও উড়াল (এলিভেটেড) মিলিয়ে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ৯টি স্টেশন থাকবে মাটির নিচে এবং বাকি ৫টি স্টেশন হবে উড়ালপথে। পাতাল অংশের স্টেশনগুলো হলো—গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২ ও নতুন বাজার। অন্যদিকে উড়াল অংশের ৫টি স্টেশন থাকবে হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারা এলাকায়।
আগের প্রস্তাবে যা ছিল
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ডিএমটিসিএল এই দুটি মেট্রো লাইনের সংশোধিত প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠায়, যা পরে পরিকল্পনা কমিশনে যায়।
এমআরটি লাইন-১ এর জন্য ডিএমটিসিএল সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব করেছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাপানের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণ দেওয়ার কথা ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে সংশোধিত সময়সীমা ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ এর ক্ষেত্রে ডিএমটিসিএল সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব করেছিল ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এতে জাপানের ঋণ ধরা হয়েছিল ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, যেখানে জাপানের অংশ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংশোধিত সময়সীমা ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
খরচ বাড়ল কেন
দরপত্র জমার পর বিভিন্ন প্যাকেজের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই দুই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। খরচ কমানোর লক্ষ্যে ওই সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাপান সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও জাপান সফর করেন। কিন্তু জাপানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পের কাজ থমকে যায়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ব্যয় কমিয়ে প্রকল্প পুনরায় চালুর জন্য জাপানের সঙ্গে দর-কষাকষির নির্দেশ দেন।
সরকার কর্তৃক গঠিত একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের মূল্যায়নে জানায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং নতুন কর আরোপের কারণে এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর ব্যয় প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
গত মে মাসে গঠিত সাত সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ইমেরিটাস অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ‘পাঁচ-সাত বছর আগে যখন মূল ডিপিপি তৈরি হয়েছিল, তখনকার তুলনায় এখন সবকিছুর দাম অনেক বেড়ে গেছে।’
এই কমিটি ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে হিসাব করেছে। শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ‘টাকার বিপরীতে ডলারের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে, সেই সঙ্গে নতুন সরকারি করও যুক্ত হয়েছে।’ কয়েকটি স্টেশনের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তনের কথাও জানান তিনি। এসব হিসাব করেই কমিটি দুটি এমআরটি লাইনের মোট ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছিল।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুন পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ এ ৩ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা এবং লাইন-৫ এ ৫ হাজার ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এদিকে, ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) হতে যাচ্ছে বিএনপি সরকারের আমলে অনুমোদন পেতে যাওয়া প্রথম এমআরটি প্রকল্প। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনটি গাবতলী থেকে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল ও তেজগাঁও হয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত যাবে।

