ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কেন্দ্র ভ্যাটিকানে তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। পোপ চতুর্দশ লিও ভ্যাটিকানের অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশনের’ (যোগাযোগ বিভাগ) প্রিফেক্ট বা প্রধান হিসেবে মারিয়া মন্তসেরাত আলভারাদো নামে এক নারীকে নিয়োগ দিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে তিনি এই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং বিদায়ী প্রধান পাওলো রুফিনির স্থলাভিষিক্ত হবেন।
এই নিয়োগটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আলভারাদো হলেন ভ্যাটিকানের কোনো বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রথম ‘লেউইম্যান’ বা সাধারণ নারী। এমনকি তিনি মঠবাসিনী বা সন্ন্যাসিনীও নন।
মাত্র ৩৯ বছর বয়সী এই নারী রোমান কুরিয়ার (ভ্যাটিকানের প্রশাসনিক কাঠামো) সবচেয়ে কম বয়সী প্রধান হতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে বিশ্বজুড়ে ক্যাথলিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রচারমাধ্যম দ্য ট্যাবলেট।
মারিয়া মন্তসেরাত যে বিশাল প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তার শেকড় প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। বর্তমানের ‘ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন’ মূলত শতাব্দীপ্রাচীন নানা শাখা ও ঐতিহ্যের এক আধুনিক সংমিশ্রণ।
ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাটিকানের এই বিভাগের সবচেয়ে পুরোনো পদক্ষেপটি ছিল প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা।
১৫৮৭ সালের ২৭ এপ্রিল পোপ পঞ্চম সিক্সটাস একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর ১৮৬১ সালের ১ জুলাই ইতালীয় ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ভ্যাটিকানের দৈনিক সংবাদপত্র ‘ল’অসজারভেতোরে রোমানো’।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ও পোপের লেখা প্রকাশের প্রয়োজনে ১৯২৬ সালে প্রিন্টিং প্রেস থেকে আলাদা হয়ে যাত্রা শুরু করা হয় ভ্যাটিকানের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থার।
বিংশ শতাব্দীতে ভ্যাটিকান আধুনিক গণমাধ্যমের দিকে ক্রমশ পা বাড়াতে থাকে।
১৯৩১ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কোনির নকশায় এবং পোপ একাদশ পিয়াসের হাত ধরে সম্প্রচার শুরু করে ‘ভ্যাটিকান রেডিও’।
এর কিছুদিন পরেই, ১৯৩৯ সালে পোপ ও ভ্যাটিকানের প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ সরাসরি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিতে খোলা হয় ‘হোলি সি প্রেস অফিস’।
গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র ও রেডিওর বিষয়গুলো সুশৃঙ্খলভাবে দেখভালের জন্য ১৯৬৪ সালে পোপ পল ষষ্ঠ গঠন করেন ‘পন্টিফিকাল কমিশন ফর সোশ্যাল কমিউনিকেশনস’।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভ্যাটিকান দৃশ্যমাধ্যম ও ডিজিটাল দুনিয়াতেও পা রাখে। পোপ দ্বিতীয় জন পল ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভ্যাটিকান টেলিভিশন সেন্টার’। আর ১৯৯৫ সালে ‘vatican.va’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভ্যাটিকান প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটের দুনিয়ায় প্রবেশ করে।
অবশেষে, এই দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে লালিত ৯টি ভিন্ন মিডিয়া শাখাকে আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে দিতে ২০১৫ সালের ২৭ জুন সাবেক পোপ ফ্রান্সিস এগুলোকে একটি একক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন আজকের ‘ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন’।
২০১৮ সালে পাওলো রুফিনি এই বিভাগের প্রথম সাধারণ নাগরিক বা ‘লে-পারসন’ প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার অবসরের পরই এই পদে এলেন একজন নারী।
গার্ডিয়ান জানায়, মারিয়া মন্তসেরাত ‘মন্তসে’ আলভারাদো মেক্সিকো সিটিতে জন্মগ্রহণকারী ও যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে বেড়ে ওঠা একজন ক্যাথলিক।
২০০৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন বলে জানায় দ্য ট্যাবলেট।
তিনি ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিকাল ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
২০০৯ সালে তিনি ওয়াশিংটন-ভিত্তিক অলাভজনক আইনি প্রতিষ্ঠান ‘বেকেট ফান্ড ফর রিলিজিয়াস লিবার্টিতে’ যোগাযোগ বিভাগে কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পদেও উন্নীত হন।
২০২১ সালে তিনি ক্যাথলিক গণমাধ্যমে যুক্ত হন এবং ‘ইডব্লিউটিএন নিউজ ইন ডেপথ’ নামের একটি সাপ্তাহিক সংবাদ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
ভ্যাটিকানে নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যাথলিক সংবাদমাধ্যম ইটারনাল ওয়ার্ড টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বা ইডব্লিউটিএনের প্রেসিডেন্ট ও চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ভ্যাটিকানের মতো একটি রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানে নারীদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে মূলত চার্চের আধুনিকায়ন ও সংস্কার ভাবনা কাজ করেছে।
সাবেক পোপ ফ্রান্সিস তার ১২ বছরের দায়িত্ব পালনকালে ভ্যাটিকানে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শীর্ষ প্রশাসনিক পদে সাধারণ নারীদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
তিনি ক্যাথলিক চার্চের ভেতরে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারও কড়া সমালোচনা করেছিলেন বলে জানায় গার্ডিয়ান। মৃত্যুর আগে সিস্টার রাফায়েলা পেত্রিনি ও সিস্টার সিমোনা ব্রামবিলার মতো নারীদের শীর্ষ পদেও বসিয়েছিলেন।
বর্তমান পোপ চতুর্দশ লিও তার পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসের দেখানো সেই সংস্কারের পথেই হাঁটছেন।
চার্চের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও মিশনারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও বেশি কার্যকর করার লক্ষ্যেই মূলত এই রদবদল আনা হয়েছে।
‘ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন’ মূলত হোলি সি বা ভ্যাটিকানের পুরো যোগাযোগ ও গণমাধ্যম ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করে।
ক্রমবর্ধমান মাল্টিমিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চার্চের মিশনকে এগিয়ে নেওয়াই এই বিভাগের মূল লক্ষ্য।
এই বিভাগের অধীনে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী মিডিয়া আউটলেটও পরিচালিত হয়।
১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রেডিও স্টেশনটি প্রায় ৪০টি ভাষার সম্পাদকীয় দলের মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তে পোপের বার্তা ও ভ্যাটিকানের খবর সম্প্রচার করে।
এটি ভ্যাটিকানের দৈনিক সংবাদপত্র, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬১ সালে। পোপের যাবতীয় কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক নানা খবর প্রকাশ করে ল’অসজারভেতোরে রোমানো।
এটি ভ্যাটিকানের আধুনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা তথ্যপ্রবাহের মাধ্যম।
এছাড়াও, ভ্যাটিকান মিডিয়া, হোলি সি প্রেস অফিস, ভ্যাটিকান পাবলিশিং হাউস এবং ১৫৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ভ্যাটিকান প্রিন্টিং প্রেস এই বিভাগের অধীনে কাজ করে।
ভ্যাটিকানের মতো একটি শতাব্দীপ্রাচীন ও ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ-শাসিত প্রতিষ্ঠানে একজন ৩৯ বছর বয়সী সাধারণ নারীর শীর্ষ পদে আরোহণ একটি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
মারিয়া মন্তসেরাত আলভারাদোর এই ঐতিহাসিক নিয়োগ প্রমাণ করে যে, ক্যাথলিক চার্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব এবং নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

