ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, ‘এসব পরিস্থিতি তৈরি করে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের পথ সুগম করছে কি না, সেটি মনে হয় ভেবে দেখা প্রয়োজন আমাদের।’

‘এই বাংলাদেশ আর কখনোই তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না,’ বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

আজ বুধবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অবশ্যই আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম-অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। বছরের পর বছর ঘর-বাড়িছাড়া হয়েছিলেন। শুধুমাত্র জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছিলেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু। আহত হয়েছিলেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ।’

সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং হতাহত পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পরাজিত, পতিত, বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা, এমন বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল।’

ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুন-অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নৃশংসতা, শুধুমাত্র স্বাধীনতা পরবর্তী তৎকালীন সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গে তুলনা চলে।’

‘আজকের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস যেমন তুলে ধরবে, অপরদিকে তাদের সামনে উন্মোচিত হবে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ। এই স্মৃতি জাদুঘর আমাদের জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। আমি আশা করি, এই জাদুঘর শুধুমাত্র ২০২৪ সালের নৃশংস ঘটনার স্মারক হবে না, এই জাদুঘর বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্ক তুলে ধরবে। শুধুমাত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থানই নয়, এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকা জরুরি,’ যোগ করেন তিনি।

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কখনোই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। এদেরই পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এসব ইতিহাস জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই উপকৃত হবে।’

‘আমি আশা করি, এই জাদুঘরে জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিচয় ও জীবনকথা, আহতদের স্বাক্ষর, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বীর ছাত্র-জনতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক ও ডিজিটাল উপাদান সংরক্ষিত থাকবে,’ বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না। বরং তা ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং প্রতিটি বিষয়ের যথাসম্ভব সত্যতা নিশ্চিত থাকা প্রয়োজন।’

পর্যায়ক্রমে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার হবে বলেও শহীদ পরিবারকে আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকার মনে করে, আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি জানান, বিগত ১৭ বছর ও জুলাই আন্দোলনে শহীদ, গুম-খুনের শিকার মানুষের নামে তাদের এলাকায় যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে, এই জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। কারণ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’

তিনি বলেন, আমি প্রায়ই একটি কথা বলি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভোলেননি, একইভাবে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় শহীদের জনগণ কখনোই ভুলবে না।

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সহায়তা করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক, উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

একইসঙ্গে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও কাজ শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর-সমৃদ্ধ, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে চাই, বলেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts