ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে মহাতারকা রোনালদোর যত কীর্তি

২০০২ সালে পেশাদার ফুটবলে পা রাখার পর থেকে লিসবন, ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ হয়ে বর্তমানে সৌদি আরবে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ক্লাব ও দেশের হয়ে ইউরোপ জয় করেছেন, আর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অভাবনীয় ১ হাজার গোলের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একজন ফুটবলারের পক্ষে যত সাফল্য পাওয়া সম্ভব, তার প্রায় সবই অর্জন করেছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। আক্ষেপ কেবল একটাই— দেশকে একটি বিশ্বকাপ জেতানো। ২০২৬ সালটি কি সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের বছর হতে পারে?

রোনালদোর এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে থাকাকালীন একজন ড্রিবলার থেকে তিনি পরিণত হন এক ভয়ংকর গোলমেশিনে। দূরপাল্লার শট, ফ্রি-কিক আর অসাধারণ সব হেডে তিনি হয়ে ওঠেন অদ্বিতীয়। ইউনাইটেডের হয়ে নয়টি ট্রফি জেতার পর ২০০৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান তিনি। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে মাত্র ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করে ক্লাবটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে বিদায় নেন, তার আগে জেতেন ১৫টি শিরোপা।

এরপর ইউভেন্তাসের হয়ে পাঁচটি শিরোপা জিতে ফের ম্যানচেস্টারে নাম লিখিয়ে সংক্ষিপ্ত এক অধ্যায় পার করেন সিআর সেভেন খ্যাত এই ফরোয়ার্ড। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি খেলছেন সৌদি ক্লাব আল নাসরে, যাদের হয়ে সম্প্রতিই জিতেছেন প্রো লিগের শিরোপা।

পরিসংখ্যানে রোনালদোর বিশ্বকাপ যাত্রা:

* এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পাঁচটি আসরে খেলার বিরল রেকর্ডের অংশীদার রোনালদো। ২০০৬ সালে বিশ্বমঞ্চে অভিষেকের পর একে একে ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগালের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছেন তিনি। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি পাশে বসেছেন জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি এবং মেক্সিকোর আন্তোনিও কারবাহাল, রাফায়েল মার্কেজ ও আন্দ্রেস গুয়ার্দাদোর পাশে— যারাও পাঁচটি বিশ্বকাপে মাঠে নেমেছেন।

* কেবল অংশ নেওয়াই নয়, ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের পাঁচটি আসরেই গোল করার এক অভাবনীয় কীর্তি গড়েছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। সবশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দোহার ৯৭৪ স্টেডিয়ামে ঘানার বিপক্ষে ম্যাচের ৬৫তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে এই অনন্য রেকর্ড গড়েন তিনি। উল্লেখ্য, চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের মাত্র চারজন খেলোয়াড়ের— ব্রাজিলের পেলে, আর্জেন্টিনার মেসি এবং জার্মানির উয়ে সিলার ও মিরোস্লাভ ক্লোসার।

* বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডটিও নিজের করে রেখেছেন সিআর সেভেন। রাশিয়া বিশ্বকাপে ২০১৮ সালের ১৫ জুন সোচিতে স্পেনের বিপক্ষে এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে এই কীর্তি গড়েন তিনি। সেদিন ৩৩ বছর ১৩০ দিন বয়সে মাঠে নেমে স্প্যানিশদের বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতে পর্তুগালের তিনটি গোলই এসেছিল তার জাদুকরী পা থেকে।

* বয়স যে তার কাছে শুধুই একটি সংখ্যা, সেই প্রমাণ মেলে কাতার বিশ্বকাপেও। ঘানার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের ওই ম্যাচটিতে ডেডলক ভাঙা পেনাল্টি গোলটির দিনে রোনালদোর বয়স ছিল ৩৭ বছর ২৯২ দিন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের তৃতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখান।

* ফুটবলের এই মহোৎসবের মূল পর্বে ওঠার লড়াই অর্থাৎ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ইতিহাসেও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এই পর্তুগিজ অধিনায়ক। ৫২টি ম্যাচ খেলে রেকর্ড ৪১টি গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন গুয়াতেমালার কার্লোস রুইজের ৩৯ গোলের আগের কীর্তিকে। বাছাইপর্বে তার এই গোল-উৎসবের শুরু ২০০৬ আসরে, যেখানে ১২ ম্যাচে তিনি করেছিলেন ৭ গোল। ২০১০ বাছাইপর্বের ৭ ম্যাচে জালের দেখা না পেলেও ২০১৪ বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে করেন ৮ গোল। ২০১৮ সালের বাছাইপর্বে ৯ ম্যাচে ১৫ গোল করে রীতিমতো বিধ্বংসী রূপ দেখান তিনি। এরপর ২০২২ বাছাইপর্বে ৯ ম্যাচে ৬ গোল এবং সবশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ৫ ম্যাচে ৫ গোল করে নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন রোনালদো।

* বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে পর্তুগালের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও রোনালদোর দখলে। বিশ্বমঞ্চে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২২টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, যা টুর্নামেন্টের সার্বিক ইতিহাসেও পঞ্চম সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। এই ২২ ম্যাচে তিনি মোট ৮টি গোল করেছেন। তবে বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি এখনও ভাঙতে পারেননি তিনি। কিংবদন্তি ইউসেবিও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ৬টি ম্যাচ খেলেই ৯টি গোল করে দেশের পক্ষে শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজের সিংহাসন অক্ষুণ্ন রেখেছেন।

Related Articles

Latest Posts