‘প্রথম ১২ হাজার টাকা সম্মানি পেয়েছিলাম, গাড়ি কিনেও মাকে দেখাতে পারিনি’

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’-এ অভিনয়ের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পান তিনি।

বর্তমানে কানাডায় আছেন ববিতা। সেখান থেকে গত রাতে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন অভিনয়ে আসার গল্প, প্রথম নায়িকা হওয়ার স্মৃতি এবং জীবনের কষ্টের কথা।

ববিতা বলেন, ‘সিনেমা করব, নায়িকা হব, রূপালি পর্দায় আমাকে দেখা যাবে, মানুষ আমাকে চিনবে—এমন কোনো ভাবনা কখনো আমার মধ্যে ছিল না। অভিনয়ের প্রতিও আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং শুটিংয়ের কষ্ট দেখে মনে হতো, মানুষ এত পরিশ্রম করে কীভাবে অভিনয় করে! আমি তো পারব না।’

Babita

শৈশবের একটি স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। সুচন্দা আপার সঙ্গে শুটিং দেখতে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে বালুর ওপর তিনি শুটিং করছিলেন। কখনো দৌড়াচ্ছেন, কখনো হাঁটছেন। তার কষ্ট দেখে মনে হয়েছিল, অভিনয় আমার কাজ নয়। এটা অনেক কঠিন।’

কিন্তু সেই ভাবনাই শেষ পর্যন্ত বদলে যায়। কয়েক মাস পর জহির রায়হান ‘সংসার’ সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সিনেমাতে নায়ক রাজ্জাক ও নায়িকা সুচন্দা। তাদের সন্তানের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য একটি ছোট মেয়ের প্রয়োজন ছিল। জহির রায়হান তখন ববিতার কথা বলেন।

‘সব শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। অভিনয় কীভাবে করব! শেষ পর্যন্ত অবশ্য অভিনয় করলাম। প্রথম সিনেমায় রাজ্জাক ভাইকে বাবা আর সুচন্দা আপাকে মা ডাকতাম,’ বলেন ববিতা।

Ekushey Padak has surpassed all my other awards: Babita | The Daily Star

তখন তার নাম ছিল পপি। পরে জহির রায়হানের উর্দু সিনেমা ‘জ্বলতে সুরাজ কে নিচে’-তে নায়িকা হওয়ার সুযোগ আসে। সিনেমাটিতে প্রথমে নায়িকা হিসেবে শবনমকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি সময় দিতে পারছিলেন না। তখন ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী জহির রায়হানকে ববিতার কথা বলেন।

ববিতা বলেন, ‘প্রস্তাব পাওয়ার পর আমি রাজি হতে চাইনি। আমি তো অভিনয়ই জানি না, তার ওপর উর্দু ভাষায় সংলাপ বলতে হবে। সব মিলিয়ে আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জহির ভাইয়ের জন্যই অভিনয় করি।’

এরপর ঢাকাই সিনেমায় নায়িকা হিসেবে ববিতার যাত্রা শুরু হয় ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে। সেই সিনেমাতে তার নাম হয় ববিতা। এরপর সেই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

_mg_6663.jpg

প্রথম নায়িকা হিসেবে সেই সিনেমা করে ১২ হাজার টাকা সম্মানি পেয়েছিলেন ববিতা। তার ভাষায়, ‘সেই সময় ১২ হাজার টাকা অনেক টাকা। প্রথম নায়িকা হয়ে ১২ হাজার টাকা সম্মানি পেয়েছিলাম। এরপর পরিচিতি বাড়তে থাকে। একের পর এক সিনেমার প্রস্তাব আসতে থাকে। আমিও সিনেমার পর সিনেমা করে যাই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।’

প্রথম নায়িকা হিসেবে পাওয়া সেই সম্মানির টাকা দিয়ে কী করেছিলেন? ববিতা বলেন, ‘গাড়ি কিনেছিলাম। তখন আমরা গেন্ডারিয়ায় থাকতাম। নতুন গাড়ি কিনে মাকে দেখাব—এই আনন্দ ছিল। কিন্তু মাকে দেখাতে পারিনি।’

Babita

এরপর কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘মা তখন হাসপাতালে ছিলেন, অসুস্থ। নতুন গাড়ি নিয়ে মাকে দেখাতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে জানতে পারি, মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।’

কথা বলতে বলতে ববিতার কণ্ঠে জমে ওঠে দীর্ঘদিনের কষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে অনেক কিছু এসেছে। অনেক নাম হয়েছে, পরিচিতি হয়েছে। কিন্তু মা কিছুই দেখে যেতে পারেননি। এই কষ্টটা আমি আজীবন বয়ে বেড়াব।’

Related Articles

Latest Posts