পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি অনেকের কাছেই রকেট সায়েন্সের মতো জটিল মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে প্রক্রিয়াটি বোঝা খুব কঠিন নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো—এটি নিরাপদে পরিচালনা করা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা।
পারমাণবিক শক্তি মূলত দুইভাবে উৎপন্ন হয়—নিউক্লিয়ার ফিউশন ও নিউক্লিয়ার ফিশন।
নিউক্লিয়ার ফিউশনে দুটি পরমাণু একত্রিত হয়ে একটি নতুন পরমাণু তৈরি করে, যার ফলে বিপুল শক্তি নির্গত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সূর্যে হাইড্রোজেন পরমাণু একীভূত হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তিই সূর্যকে আলোকিত রাখে ও পৃথিবীতে প্রাণধারণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখে।
তবে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সত্ত্বেও মানুষ এখনও এই প্রক্রিয়াটি নির্ভরযোগ্যভাবে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
অন্যদিকে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পদ্ধতিটি কার্যকর ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী, তা হলো নিউক্লিয়ার ফিশন। এ প্রক্রিয়ায় একটি পরমাণুকে ভেঙে ফেলা হয় এবং এতে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়।
এটি করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুকে একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা। এতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভেঙে গিয়ে প্রচুর শক্তি এবং কয়েকটি নতুন নিউট্রন নির্গত করে। এই নিউট্রনগুলো আবার অন্য ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুকে আঘাত করে একই প্রক্রিয়া চালু রাখে। এভাবে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি হয়।
এই বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এই চেইন রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে রিঅ্যাক্টরের কোরে ইউরেনিয়াম ফুয়েল রডের পাশাপাশি কন্ট্রোল রড বসানো হয়। এসব কন্ট্রোল রড নিউট্রন শোষণ করে, ফলে অতিরিক্ত নিউট্রন অন্য পরমাণুকে আঘাত করতে পারে না এবং বিক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত থাকে।
খনি থেকে পাওয়া ইউরেনিয়ামের অধিকাংশই ইউরেনিয়াম-২৩৮, যা ফিশন প্রক্রিয়ার জন্য কার্যকর নয়। মোট ইউরেনিয়ামের মাত্র শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ ইউরেনিয়াম-২৩৫। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়ামকে সমৃদ্ধ (এনরিচ) করতে হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এটি প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ছোট ছোট পেলেট আকারে তৈরি করে এক ধরনের বিশেষ ধাতব টিউবের ভেতরে রাখা হয়, যেগুলোকে বলা হয় ফুয়েল রড।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আকবর জানান, একটি ফুয়েল রডে প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৮০টি পেলেট থাকে। একটি রডের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ৯৩ থেকে ৪ মিটার এবং ব্যাস প্রায় ৯ দশমিক ১ মিলিমিটার। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে মোট জ্বালানির ওজন ৮০ টনের বেশি হতে পারে।
যখন রিঅ্যাক্টরের কোরে সব জ্বালানি লোড করা হয়, তখন কন্ট্রোল রড আংশিকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয় ও প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।
এই তাপ ব্যবহার করে পানিকে উত্তপ্ত করা হয়। রূপপুর কেন্দ্রের ক্ষেত্রে পানিকে উচ্চচাপে রাখা হয়। সাধারণ অবস্থায় পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটে উঠলেও উচ্চচাপের কারণে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাতেও পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হয় না।
এই অতিরিক্ত উত্তপ্ত পানি অন্য একটি চেম্বারের পানিকে ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, যা একটি জেনারেটরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
জেনারেটরের কাজ অনেকটা বৈদ্যুতিক মোটরের মতো হলেও এটি উল্টোভাবে কাজ করে। মোটর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে শ্যাফট ঘোরায়, আর জেনারেটরে শ্যাফট ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

