পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় ‘অচল’ চট্টগ্রাম

মৌসুমি বৃষ্টিতে অচল হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের উপজেলাগুলো। জেলায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থগিত করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা এবং ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাসে ২৪ ঘণ্টায় তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আজও অব্যাহত ছিল দুর্ভোগ। এদিন বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয় মোট ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।

আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয়বাষ্পে সৃষ্ট ঘন মেঘমালার কারণেই এই প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। সমুদ্র বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখানো হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাদ যায়নি নগরীর প্রধান সড়ক ও আবাসিক অঞ্চলগুলোও। এর মধ্যে রয়েছে কাট্টলী, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া (কেবি আমান আলী রোড), আগ্রাবাদ, হালিশহর, হাটহাজারী রোডের বড় দিঘীর পাড়, কাপাসগোলা ও অক্সিজেন-মদুনাঘাট সড়ক।

জলাবদ্ধতায় গণপরিবহন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। বড় দিঘীরপাড় এলাকা থেকে আমাদের প্রতিবেদক জানান, সেখানে পানি কোমর সমান এবং ডজনখানেক আন্তঃজেলা চলাচলকারী বাস সেখানে আটকে আছে।

সোমবার রাত থেকেই বাজারগুলোর নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়ে। চকবাজারের আধুনিক চক সুপার মার্কেট বন্ধ রাখতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা। মার্কেটের নিচতলার ব্যবসায়ী আবু তাহের বলেন, ‘গত সপ্তাহেই প্রায় ৫ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলাম। পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, আগে থেকেই নালা-খাল পরিষ্কার করায় কিছু এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। কিন্তু, অনেক এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আজও পানি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও রেললাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পানির নিচে ডুবে রয়েছে। ষোলশহর ২ নম্বর গেট থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত রেললাইনের অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে সব ধরনের ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ঢাকা থেকে চলাচলকারী দুটি এবং চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী দুটিসহ মোট চারটি ট্রেনের যাওয়া-আসা বন্ধ হয়ে রয়েছে এবং শত শত পর্যটক ও নিয়মিত যাত্রী আটকা পড়েছেন।

অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, উপচে পড়া খাল ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণেই এমন জলাবদ্ধতা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের ষোলশহর-জান আলী হাট অংশে প্রায় দেড় কিলোমিটার রেললাইন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পানির নিচে ছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শামসের পাড়া পর্যন্ত রেললাইন পানির নিচে ডুবে রয়েছে। সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় রেললাইনের পাশের খালের পানি উপচে লাইনের ওপর চলে আসে। আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গাগুলোও প্লাবিত হয়েছে। শামসের পাড়ায় রেললাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল এবং লাইনের কিছু অংশ পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

শামসের পাড়ায় প্লাবিত রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ৪৮ বছর বয়সী আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরে এখানে থাকি। কিন্তু রেললাইন এভাবে পানির নিচে তলিয়ে যায়, সেটা কোনোদিন দেখিনি। আমার মনে হয় খালগুলোতে সমস্যা আছে। তা না হলে এতক্ষণে পানি নেমে যেত।’

বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘রেললাইনের ওপর তিন থেকে ছয় ইঞ্চি পানি থাকলে ট্রেন নিরাপদে চলতে পারে। কিন্তু মুরাদপুরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা ও জান আলী হাট এলাকায় আমরা প্রায় ১৫ ইঞ্চি পানি পেয়েছি। এ অবস্থায় ট্রেন চালালে লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।’

জলাবদ্ধতার কারণে পর্যটক এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকার পর গতকাল রাতে যাত্রা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া, গতকাল দুপুর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো এবং এটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের (চট্টগ্রাম) বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু ইমতিয়াজ মোহাম্মদ রাফি বলেন, ‘আমরা দুইবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। রেললাইনের পাশের বেশ কয়েকটি পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে আছে। এ ছাড়া, রেল করিডরের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ অস্থায়ী ও আধাপাকা স্থাপনাগুলোও পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।’

তিনি বলেন, ‘নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে না। সেইসঙ্গে গত প্রায় চার দশকের মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। নিষ্কাশন ব্যবস্থা এত পানি সামাল দিতে পারেনি।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) একটি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিশ্চিত করেছে যে, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে না।

ঘটনাস্থলে নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ তদারকি করছেন চসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আবু তাহের সিদ্দিক। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনের পাশ দিয়ে সদর খাল ও সুন্নিয়া খাল প্রবাহিত হয়েছে। বিপুল বৃষ্টির পানি ধারণ করতে না পারায় সদর খালের পানি উপচে রেললাইনের ওপর উঠে আসে। এ ছাড়া, সুন্নিয়া খালের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় এর পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতাও কমে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্ষা শুরুর আগেই সদর খাল ও সুন্নিয়া খাল পরিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু, খাল দুটি অতিবৃষ্টির এত বেশি পানি বহন করতে পারেনি।’

তিনি জানান, পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে এবং জলাবদ্ধতা দ্রুত কমাতে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ও খাল-নালা পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে।

টানা বৃষ্টিতে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ২৪ ঘণ্টায় পাহাড় ও দেয়ালধসে জেলায় অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বায়েজিদ এলাকার চশমা পাহাড়ে আজ সকাল ৯টার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে একটি টিনের ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ বছর বয়সী সুমাইয়ার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, সীতাকুণ্ড উপজেলার সালিমপুরের ছিন্নমূল এলাকার সোসাইটি-৬-এ পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি চাপা পড়ে ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীরের মৃত্যু হয়।

পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী নিম্নআয়ের অনেক বাসিন্দাই স্বীকার করেছেন, তারা এখানে বসবাসের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু যাওয়ার মতো কোনো জায়গা না থাকায় এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন।

ষোলশহরের চশমা পাহাড়ে বসবাসকারী মো. নাজিম বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে মালিককে ভাড়া দেওয়ার পর দিনে ৪০০ টাকাও থাকে না। এই সামান্য আয় দিয়ে আর কোথায় গিয়ে থাকব বলেন।’

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি থামবে বলে আশা করছিলাম। কিন্তু এখন আকাশের অবস্থা দেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য জিনিসপত্র গোছাচ্ছি।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে মাইকিং করে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেনও পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারীদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

জরুরিভিত্তিতে শুকনো খাবার বিতরণ করা হলেও স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, অনেক বাসিন্দাই নিজেদের মালামাল ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনিচ্ছুক।

নগরীর বাইরে প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে।

আনোয়ারার এইচএসসি পরীক্ষার্থী আকলিমা শারমিন বলেন, ‘এতক্ষণ ধরে বিদ্যুৎ নেই। পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে পারছি না।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কারিগরি দল দিনরাত কাজ করছে। পাশাপাশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বুধবারের নির্ধারিত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও দিনের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বাতিল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বৈরী আবহাওয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়কে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জেলার অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনির্ধারিত ছুটি ঘোষণা করেছে।

Related Articles

Latest Posts