নেপালে বন্যা: এক শিক্ষকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে যেভাবে বেঁচে গেল ৯০০ শিক্ষার্থী

‘আমি ও আমার বন্ধুরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি’, বলছিল ১৬ বছর বয়সী ইউনিশা।

নেপালের নুয়াকোটের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বিবিসিকে জানায়, বন্যার পানি আসার মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে স্কুল থেকে বের হতে সক্ষম হয় সে ও তার বন্ধুরা।

ইউনিশাসহ ওই স্কুলের ৯০০ শিক্ষার্থী প্রাণে বেঁচে যায় শুধু প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির সঠিক সময়ে নেওয়া দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে।

গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও ভূমিধসে যে বন্যা সৃষ্টি হয়, সেটি ত্রিশূলী নদী দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে নিচে নেমে আসে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজার লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় মুহূর্তেই। ত্রিশূলী নদীর কাছেই স্কুলটি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র যদি ক্ষণিকের জন্যও দ্বিধা করতেন, তবে ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ স্মৃতি হয়ে থাকত।

বিবিসিকে তিনি জানান, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি চারটি সতর্কবার্তা পান। এর মধ্যে একটি ছিল উজানে বেত্রাবতী জনপদে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে এবং সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এরপরই শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৬০০।

রাজেন্দ্র দাওয়াদি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্তও দেরি না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বন্যা না এলেও সমস্যা নেই, শুধু একদিনের ক্লাসই নষ্ট হবে।’

এরপর তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে থাকেন। সেসময় তিনি দেখতে পান, নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি আবাসিক ভবন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আর ১০ মিনিট দেরি করতাম সিদ্ধান্ত নিতে, তাহলে আজ আমি বা আমার শিক্ষার্থীরা কেউই আপনাদের সামনে কথা বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না।’

শিক্ষার্থী ইউনিশা জানায়, প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুলের পেছনের সরু ও কাদাময় পথ ধরে দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠছিল সে। পেছনে ফিরে সবকিছু তছনছ হওয়ার দৃশ্য দেখে শিউরে উঠছিল।

তার ভাষ্য, ‘চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যেই বাজারটি ভেসে গেল।’

ইউনিশার মা সাবিনা জানান, বন্যার খবর পাওয়ার পর থেকে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোনে অনেকবার চেষ্টা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। মেয়েকে ও তার বাবাকে বারবার ফোন করছিলাম, কিন্তু কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।’

পরে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে কিছুটা স্বস্তি পান সাবিনা। তবে ইউনিশা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

বন্যার তিন দিন পর বাড়িতে ফেরেন ইউনিশা।

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন মা সাবিনা। তবে এই কান্না বেদনার নয়, এই কান্না ছিল আনন্দের।

Residents gathered on higher ground for safety as river-water levels rose in Roshuki Bazar in Nepal https://t.co/NC70D578m5 pic.twitter.com/kW8VUp8hoX

— Reuters (@Reuters) August 30, 2026

এক প্রতিবেদনে কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আটকে পড়া প্রায় ৪০ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে উদ্ধার করে বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, নদীটি এখন স্কুলের মাঠের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। সেখানে ক্লাস শুরু করার কোনো উপায় নেই।

আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যায় রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার ২০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী সংলগ্ন বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলের শ্রেণিকক্ষগুলো কাদা, বালি ও পলিমাটিতে ভরে গেছে।
 

দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাসুয়ায় ৫টি, নুয়াকোটে ৭টি এবং ধাদিংয়ে ৮টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নুয়াকোটের ত্রিভুবন মাল্টিপল ক্যাম্পাস এবং ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হোস্টেল বন্যায় তলিয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলোর বেশিরভাগই কমিউনিটি স্কুল বা বেসরকারি স্কুল।

Related Articles

Latest Posts