নির্মাণের ২ বছরেও চালু হয়নি সরকারি ৮ শান্তি নিবাস

রাফসান আরা বেবীর কাছে বার্ধক্যের দিনগুলো মানে ঢাকার একটি অলাভজনক প্রবীণ সেবাকেন্দ্রে সময় পার করা। সত্তরোর্ধ্ব এই নারীর দুই সন্তান বাস করেন লন্ডনে। তার দেখভাল করার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ নেই পরিবারে। ফলে ‘প্রবীণ নিবাস’ তার একমাত্র ভরসা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বয়স ছিল ৬০ বছর বা তার বেশি।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার বেড়ে ১৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

প্রবীণদের আশ্রয়ে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট না হওয়ায় অনেক বয়স্ক মানুষকে নির্ভর করতে হয় অল্প কয়েকটি বেসরকারি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ওপর।

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নাগালের বাইরে। আবার, এনজিও পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সক্ষমতা ও সম্পদের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে পারছে না।

এদিকে জনবল নিয়োগে বিলম্বের কারণে এখনো চালু হয়নি প্রবীণদের জন্য নির্মিত সরকারি ৮টি শান্তি নিবাস। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রতিটি বিভাগে একটি করে নির্মিত এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ধারণ ক্ষমতা ২০০ জন।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বেবী বলেন, এখানে আশ্রয় ও সঙ্গ পাওয়া গেলেও চিকিৎসা সেবার সংকট রয়েছে।

এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তিনি—‘আমাদের চিকিৎসার জন্য ভালো কোনো ডাক্তার নেই।’

সম্প্রতি সরেজমিনে দ্য ডেইলি স্টার দেখতে পেয়েছে, দেশের অন্যতম পুরোনো প্রবীণ সেবাকেন্দ্র প্রবীণ নিবাস চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মুহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ১৯৮৩ সালে প্রবীণ নিবাস প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ৬৩টি জেলায় প্রায় ৮০টি শাখা সক্রিয় রয়েছে। তবে শুধু ঢাকার প্রধান কার্যালয়েই আবাসিক সুবিধা রয়েছে এবং ৫০ জন থাকতে পারেন। বর্তমানে সেখানে ১৭ নারী ও ১৩ পুরুষসহ ৩০ জন বাস করছেন। অনেকেই এমন, যাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই।

শামসুল বলেন, প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতাল ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বছরে প্রায় চার কোটি টাকা পায়। তবে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক নিয়োগ বা সেবার পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এজড-এর সহকারী পরিচালক আশরাফুল আলমের করা গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে শামসুল বলেন, দেশে প্রায় ১০০টি বেসরকারি বা এনজিও পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। সম্মিলিতভাবে যেখানে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার জন বাস করেন।

তবে দেশে বেসরকারি বা এনজিও পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রমের সঠিক সংখ্যা কিংবা সেগুলোর ধারণক্ষমতা সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।

প্রবীণ নিবাসে আবাসনের জন্য বাসিন্দাদের মাসে প্রায় ৮ হাজার টাকা দিতে হয়। একদম শুরুতে ভর্তি ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফি বাবদ দিতে হয় অফেরৎযোগ্য ৩ হাজার টাকা। পাশাপাশি প্রায় ৪৮ হাজার টাকা অগ্রিম জামানত দিতে হয়, যা ছয় মাসের আবাসন খরচের সমান।

শামসুল বলেন, শুরুতেই এসব খরচ বহন করতে হয় বলে অনেক প্রবীণ ও তাদের পরিবারের জন্য আবাসিক সেবা সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়।

২০২২ সালে একটি গবেষণার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গাজীপুরের বিনামূল্যের ওল্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, চট্টগ্রামের আমেনা-বাশার ওল্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ও ঢাকায় অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত প্রবীণ নিবাস—তিনটি বৃদ্ধাশ্রমের ৬০ জন বাসিন্দার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

এতে দেখা যায়, ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধাশ্রমে ওঠার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরিবারের অবহেলা, আর ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। প্রবীণ নিবাসে শেষ কারণটিই সবচেয়ে বেশি, ৫৫ শতাংশ বাসিন্দা এই কারণ উল্লেখ করেছেন।

তিনটি বৃদ্ধাশ্রম মিলিয়ে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ বাসিন্দা নিরাপত্তা নিয়ে, ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ শরীরচর্চার সুবিধা নিয়ে, ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ ধর্মীয় সুবিধা নিয়ে, ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিৎসাসেবা নিয়ে ও ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ বিনোদনমূলক সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন।

তবে খাবার নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন মাত্র ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আবাসন নিয়ে ৩৫ শতাংশ। অধিকাংশই এই ‍দুটি সেবার মানকে গড়পড়তা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

প্রবীণ নিবাসে ৬০ শতাংশ বাসিন্দা চিকিৎসাসেবা এবং ৮০ শতাংশ আবাসন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু খাবার নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন মাত্র ১০ শতাংশ।

সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিতে বিনোদনমূলক সুবিধা, চিকিৎসাসেবা ও আবাসনের মান ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিনামূল্যের প্রতিষ্ঠানগুলোতে খাবার, ধর্মীয় সুবিধা, নিরাপত্তা, শরীরচর্চা ও শেষকৃত্যের ব্যবস্থাকে তুলনামূলক ভালো হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।

এদিকে, বয়স্ক নারীদের জন্য বেসরকারিভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান আপন নিবাসে ১০০ জন বাস করেন এবং সেখানে কোনো খালি শয্যা নেই বলে জানিয়েছেন এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা সেলিনা সেলিম।

তিনি বলেন, তাদের অধিকাংশই অসহায় বা পরিত্যক্ত নারী, যাদের রাস্তা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিনামূল্যে আবাসন, খাবার ও সেবা দেওয়া হয়।

‘কখনো কখনো কাউকে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বা এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কাছে আনা হয় যে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। জায়গা না থাকলেও কোনোভাবে আমরা তাকে রাখার ব্যবস্থা করি।’

সেলিনা বলেন, চাহিদা বাড়লেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সীমিত সহায়তা পাওয়া গেলেও প্রতিষ্ঠানটি মূলত অনুদান ও বেসরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি আটটি শান্তি নিবাস চালুর অগ্রগতির ব্যাপারে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাদিকুল হক বলেন, ‘স্থায়ী পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া এখনো চলমান।’

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অনুমোদন দিয়েছে, এখন কেবল সচিব পর্যায়ের ছাড়পত্র বাকি।

আগামী মাসে এগুলো উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে, জানান সাদিকুল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে এবং বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত পারিবারিক সহায়তার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রবীণ সেবাব্যবস্থা প্রয়োজন।

‘সেবাকেন্দ্রগুলোতে শুধু আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেই হবে না, সেখানে চিকিৎসাসেবা, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাও দিতে হবে, বিশেষ করে গৃহহীন ও অসহায় প্রবীণদের জন্য,’ বলেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts