যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘এই চুক্তির কারণে সামরিক দিক থেকে, রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে এবং অস্তিত্বের দিক থেকে আমরা ভয়ংকরভাবে একটা দাসত্বের মধ্যে পড়ব।’
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আজ রোববার বিকেল ৫টার দিকে এক গণপ্রতিবাদ কর্মসূচিতে এ কথা বলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
‘দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ বাতিলের দাবিতে এই কর্মসূচির আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
সভাপ্রধানের বক্তব্যে মার্কিনচুক্তি নিয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে আনু মুহম্মদ বলেন, ‘এটা কোনো জনগোষ্ঠী, শ্রেণি-পেশা বা দলের বিষয় নয়। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, জনগণের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন।’
বাণিজ্যচুক্তির সমালোচনা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, ‘এই চুক্তির ১ নম্বর ধারা থেকে শতাধিক জায়গায় বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে তা লেখা আছে। যুক্তরাষ্ট্র কী কী করবে, সেখানে কী কী না করলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেবে লেখা আছে।’
তিনি বলেন, ‘এটা কোনো চুক্তি না। এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে যারা সই করেছেন, তারা দেখতে মানুষের মতো চেহারা। তবে তারা মার্কিন প্রশাসনের লোক। তাদের মেরুদণ্ড নেই, কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। তারা দেশের সর্বনাশের জন্য এটা করেছেন।’
পুরো চুক্তিপত্রটি ‘মার্কিন আদেশপত্র, ট্রাম্পের আদেশপত্র’ মন্তব্য করে আনু মুহম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের ঘাড়ের ওপর চেপে, গলা ফাঁস লাগিয়ে, দেশের জনগণকে মাটিতে গড়াগড়ি করিয়ে কী করবে তারা, কী করতে বাধ্য থাকবে সেগুলো আছে। এই আদেশপত্র থেকে অস্বীকার করা, পদাঘাত করা, বের হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ একটা ভয়ংকর বিপদের মধ্যে যাচ্ছে।’
ইতোমধ্যেই চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। চুক্তির সহযোগী চুক্তিগুলোও সই করা হচ্ছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস আমদানি করতে হবে। বেশি দামে এলএনজিসহ নানান ধরনের জিনিস আমদানি করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা সৃষ্টি করতে পারব না।’
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘আমাদের কৃষি, পোল্ট্রি, ডেইরিখাতগুলো গত তিন দশকে তৈরি হয়েছিল, কর্মসংস্থান হয়েছিল। এই চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ কর্মসংস্থান ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই আদেশপত্রে আছে, কোনো মান পরীক্ষা আমরা করতে পারব না। যুক্তরাষ্ট্র যে মান পরীক্ষা করবে, সেটাতেই আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। যদি বিষাক্ত, বিপজ্জনক ও হারাম পণ্য আসে, সেগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। বেশি দামে কিনতে হবে, আবার শুল্কও নেওয়া যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘রাজস্ব আয় যেটা সরকার হারাবে, সেটাতে ভর্তুকি দিতে হবে। সেটা জনগণের ওপর নতুন নতুন কর বসিয়ে, জনগণের করের আওতা সম্প্রসারণ করে, জনগণের রক্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন করপোরেট স্বার্থ রক্ষা করা হবে। এই চুক্তি বাতিল আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। দেশের সব পর্যায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই চুক্তির বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তি নিয়ে এই সরকার এখন পর্যন্ত যে ভূমিকা দেখিয়েছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। এই সরকার নির্বাচিত ও স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি। এই সরকারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির কাছে পরাভূত। জনগণের ভোট নিয়ে তারা জনবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। তা না হলে সংসদের গত অধিবেশনেই এটা নিয়ে সরকার আলাপ করত।’
‘বর্তমান সরকার নির্বাচিত সরকার, জনগণের সরকার। এই সরকারকে মানুষ নির্বাচিত করেছে। মানুষ নির্বাচিত করেছে তারেক রহমানকে। আর দেশ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প প্রশাসন, আইএমএফ, বিভিন্ন ধরনের করপোরেট স্বার্থ—এটা তো চলতে পারবে না। দেশের মানুষ যাকে নির্বাচিত করেছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং এই সরকার দায়বদ্ধ। তাকে জবাবদিহি করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
মার্কিন চুক্তি যারা করেছে, তাদের বিচারের দাবি জানিয়ে আনু মুহম্মদ বলেন, ‘ইউনুস সরকার এই চুক্তি করেছে। তাদের সঙ্গে খলিলুর রহমানসহ যারা যুক্ত ছিল, তাদের বিচার করতে হবে।’
জাতীয় সংসদে আলোচনা না করে মার্কিনচুক্তি যেন বাস্তবায়ন না করা হয়, সেই দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি, কোনো চুক্তি সংসদে আলোচনা ছাড়া যেন না হয়। চুক্তির বিস্তারিত আলোচনা করে বের হওয়ার রাস্তা বের করতে হবে। বের হওয়ার রাস্তা খুব সহজ। যেহেতু, মার্কিন আদালত ট্রাম্পের এই শুল্ক-কাঠামোকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের নূন্যতম যদি মেরুদণ্ড থাকে, নূন্যতম দায় থাকে, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে অবশ্যই চুক্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা বের করতে হবে।’
মার্কিন চুক্তি বাতিলের দাবিতে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মহাসমাবেশের ডাক দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
সভায় লিখিত বক্তব্যে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিনদিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সারা দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে, জাতীয় সংসদ না থাকা অবস্থায় এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ভয়াবহ বাণিজ্য চুক্তি সই করে। এই চুক্তিতে এমন ধারা আছে, যেগুলো কেবল দেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধীই নয়, সেগুলো একাধারে বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রবল হুমকি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী বলেন, ‘মার্কিন চুক্তিটির মাধ্যমে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এই ৩২ পাতার চুক্তির প্রথম ১০ পাতা কেউ পড়লেই গা শিউরে উঠবে। এটি মূলত বাণিজ্য চুক্তির আড়ালে একটি সামরিক চুক্তি। চুপিসারে এই চুক্তিটা করা হলো, যা বিশাল বড় ষড়যন্ত্র।’

