সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন নতুন ট্রেন্ড, দেশের কতগুলো জেলায় আপনি ভ্রমণ করেছেন সেই ম্যাপ প্রকাশ করা। অনেকে ইতোমধ্যে ৬৪টি জেলাই ঘুরেছেন, কেউ কেউ পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছেন বাকি এলাকাগুলোর কোথায় কোথায় ভ্রমণ করবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সাব্বির হোসেন রবিনের তৈরি ‘আনসিন বাংলাদেশ’ ওয়েবসাইট থেকে সহজেই এই ম্যাপ তৈরি করা যাচ্ছে।
দেড় সপ্তাহে এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করেছেন ২৩ লাখের বেশি মানুষ।
‘ভ্রমণ মানচিত্র’ তৈরির সুযোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার দর্শনীয় স্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা, আনুমানিক ব্যয়, থাকার জায়গা ও বিখ্যাত খাবারের তথ্য রয়েছে ওয়েবসাইটে। রয়েছে এআইভিত্তিক ট্রিপ প্ল্যানার।
রবিন বর্তমানে আইটি খাতে কাজ করছেন। পাশাপাশি তার নিজস্ব একটি ডিজাইন এজেন্সি রয়েছে।
রবিন জানান, ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সুযোগ পেলেই নতুন জায়গায় ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
‘নতুন নতুন জেলা ঘুরতে ঘুরতে একদিন ভাবলাম, বাংলাদেশের কতগুলো জেলা ঘোরা হলো সেটা যদি একটা ম্যাপে তুলে ধরা যায়, তাহলে মন্দ হয় না! সেখান থেকেই এই ওয়েবসাইট তৈরির ভাবনার শুরু,’ বলেন তিনি।
আগে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে এমন ম্যাপ তৈরি করতাম। প্রতিবার নতুন জেলা ঘুরে আসার পর প্রম্পট দিয়ে ম্যাপ বানাতে হতো। কোথাও ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে নানা জায়গায় খুঁজতে হতো কী কী দর্শনীয় স্থান আছে, যাতায়াত ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য খরচ কেমন।
‘তখনই মনে পড়ে এক জায়গায় সব তথ্য পাওয়া গেলে সুবিধা হতো। যেহেতু আমি আইটি সেক্টরে কাজ করি, হঠাৎ মাথায় এলো এআইয়ের সাহায্যে আমি নিজেই এমন একটা প্ল্যাটফর্ম বানাতে পারি,’ বলেন রবিন।
‘আনসিন বাংলাদেশ’ এর অন্যতম আকর্ষণ ‘আমার ম্যাপ’ অপশন। এখানে ব্যবহারকারী নিজের ঘোরা জেলাগুলো নির্বাচন করে একটি ব্যক্তিগত ভ্রমণ মানচিত্র তৈরি করতে পারেন। চাইলে এতে নিজের নাম, ছবি যোগ করা ও পছন্দ অনুযায়ী রঙের থিমও বেছে নেওয়া যায়।
রবিন জানান, ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করতে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হয় না।
ওয়েবসাইটটির ‘কোথায় ঘুরবেন’ অংশে যেকোনো জেলা নির্বাচন করলে ওই জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর তথ্য পাওয়া যায়। দেখা যায় ছবি।
এছাড়া সেখানে কীভাবে যাবেন, বাস-ট্রেন, আকাশ বা নদী পথে যেতে আনুমানিক খরচ হয়, থাকার জায়গা কেমন ও কোন কোন খাবার বিখ্যাত—সেসব তথ্য পাবেন এক ক্লিকে। কোনো স্থানের ‘বিস্তারিত দেখুন’ অপশনে গেলে পাওয়া যায় সেই স্থানের ইতিহাস ও ভ্রমণ নির্দেশিকা।
সাইটটির আরেকটি সুবিধা ‘ট্রিপ প্ল্যানার’। এখানে ব্যবহারকারী কোথায় থেকে যাত্রা শুরু করবেন, কোন কোন জেলায় যেতে চান, কত দিনের ট্রিপ, কতজন যাবেন এবং বাজেট কত, সেসব তথ্য দিলে সাইটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য রুট সাজিয়ে দেয়। সঙ্গে থাকে দিনভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং মোট আনুমানিক খরচের হিসাব।
‘শুরুতে কোনো বড় পরিকল্পনার অংশ ছিল না। সাইটটি আসলে নিতান্তই শখের বশে তৈরি করা। প্রথম সংস্করণটি ক্লাউড কোড নামে একটি এআই টুল দিয়ে মাত্র দেড় ঘণ্টায় বানিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল নিজের কাছেই রাখা। পরে মনে হয় ভ্রমণপ্রেমী সবার কাজে লাগতে পারে,’ বলেন রবিন।
নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ২৭ সেপ্টেম্বর ওয়েবসাইটটি শেয়ার করেছিলেন রবিন। এরপর সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
‘ওয়েবসাইটটি নিয়ে এতটা সাড়া পাব কল্পনাও করিনি। মাত্র ১০ দিনে ২৩ লাখের বেশি মানুষ সাইটটি ব্যবহার করেছেন।’
রবিন আরও বলেন, ‘অনেকে নিজেদের ভ্রমণ ম্যাপ তৈরি করে ফেসবুকে শেয়ার করছেন, পরিচিতদের ট্যাগ করছেন। কে কতটি জেলা ঘুরেছেন, তা নিয়েও চলছে মজার প্রতিযোগিতা। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আসছে নতুন ফিচার যুক্ত করার পরামর্শ। কীভাবে যে এত ছড়িয়ে গেল, নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি। সবার ভালোবাসা আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত করেছে।’
এই ওয়েবসাইট আরও বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন রবিন।
তিনি বলেন, ‘সামনে একটি বিশ্ব ভ্রমণ ম্যাপ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
‘দেশের আরও দর্শনীয় স্থান যুক্ত করা, প্রতিটি স্থানের তথ্য আরও বিস্তারিত করা এবং ব্যবহারকারীদের পরামর্শ অনুযায়ী নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে,’ বলেন তিনি।
রবিনের স্বপ্ন, ভ্রমণপ্রেমী মানুষের জন্য ‘আনসিন বাংলাদেশ’ এক সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি হয়ে উঠবে।

