বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে রোবোটিক সার্জারি সম্পন্ন করার দাবি করেছে ইউনাইটেড হেলথকেয়ার।
আজ সোমবার রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’-এর মাধ্যমে দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়।
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ও প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এটি একটি মাইলফলক। আমরা এই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরেছি।’
৫৭ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন তিনি। এ অস্ত্রোপচারে রোগীর পিত্তথলির পাথর অপসারণ করা হয়।
পরে জরায়ুতে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণে ভোগা ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর রোবোটিক হিস্টেরেকটমি করেন হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও প্রধান অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলি। এ অস্ত্রোপচারে ওই নারীর জরায়ু অপসারণ করা হয়।
প্রথম অস্ত্রোপচারের পর রোবোটিক সার্জারির সুবিধা তুলে ধরেন অধ্যাপক সালেহীন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘রোবটিক আর্ম ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে, যা মানুষের হাতের নড়াচড়ার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে শরীরের খুব সংকীর্ণ ও জটিল জায়গাতেও আরও নিখুঁতভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।’
‘এতে রক্তনালি ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নিরাপদ রাখা, কম কাটাছেঁড়ায় চিকিৎসা করা, রক্তক্ষরণ কমানো এবং রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়,’ যোগ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রথম অস্ত্রোপচার করা রোগীকে এক-দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
রোবোটিক সার্জারির খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনায় এ পদ্ধতি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। খরচ প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে।’
তবে ভবিষ্যতে রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বাড়লে এর খরচ কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘রোবোটিক সার্জারির নির্ভুলতা ও অন্যান্য সুবিধার কারণে বর্তমানে অনেক রোগী এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এখন থেকে তারা দেশেই এ সেবা পাবেন।’
রোবটটি অনেক আগেই দেশে আনা হয়েছিল জানিয়ে অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘কয়েকজন চিকিৎসক বিদেশ থেকে এর ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের কপি আজ দুপুরে আমাদের হাতে পৌঁছায়।’
অনুমোদন পাওয়ার পর সন্ধ্যায় অস্ত্রোপচার দুটি করা হয় বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান শেলি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নেপালসহ কয়েকটি দেশে রোবোটিক সার্জারি শুরু হলেও বাংলাদেশ এত দিন পিছিয়ে ছিল। এখন দেশেও এ ধরনের অস্ত্রোপচার শুরু হয়েছে।’
তিনি জানান, শিগগির হৃদরোগ, নিউরো, ইউরোলজি, জেনারেল, গাইনি ও থোরাসিক বিভাগেও রোবোটিক সার্জারি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদে দেশে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমানোই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এতে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও দেশে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
এর আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রিমোট রোবোটিক পদ্ধতিতে স্টেন্ট স্থাপনের একটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোফাসসেল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘হৃদরোগ হাসপাতালে করা ওই প্রক্রিয়া এবং ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে করা দুটি অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
তিনি বলেন, ‘হৃদরোগ হাসপাতালে স্টেন্ট স্থাপনের প্রক্রিয়ার একটি অংশে রোবটের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে থাকা বিশেষায়িত রোবটটি সরাসরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে।’
এছাড়া হৃদরোগ হাসপাতালে রোবটটি প্রদর্শনের জন্য আনা হয়েছিল এবং সেটি দিয়ে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় কোনো অস্ত্রোপচার করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
‘এ কারণেই আমরা এটিকে দেশে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রথম রোবোটিক সার্জারি বলছি,’ বলেন তিনি।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন জানান, প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের পর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারসহ দুটি বেসরকারি হাসপাতালকে রোবোটিক সার্জারি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘তাই এটিই (ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে করা অস্ত্রোপচার) আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম রোবোটিক সার্জারি।’

