দুই বছর ধরে বন্ধ গণহত্যা জাদুঘরের প্রদর্শনী

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার দুর্লভ সব নিদর্শন নিয়ে ২০১৪ সালে খুলনায় গড়ে তোলা হয় দেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। জাদুঘরের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাসংক্রান্ত বহু নিদর্শন, নথি ও বইপত্র থাকলেও সেগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। নিরাপত্তা না থাকায় গত ২৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে জাদুঘরের প্রদর্শনী কার্যক্রম।

স্বল্প পরিসরে কেবল গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ চালু থাকলেও সার্বিক পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় এসব কাজও ব্যাহত হচ্ছে।

জাদুঘরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে জাদুঘরের পাশের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা হাসপাতালটিতে ভাঙচুর চালান। এ সময় জাদুঘরের সামনের অংশ ও প্রধান ফটকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেদিনই জাদুঘর থেকে পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফলে জাদুঘরটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার জন্য প্রধান ফটক টিন ও বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে জাদুঘরের ভেতরে সবকিছু অক্ষত রয়েছে।

এরপর প্রায় আট মাস জাদুঘরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। পরে স্বল্প পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও প্রধান ফটক মেরামত না হওয়া এবং নিরাপত্তার অভাবে এখনো দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনী চালু করা সম্ভব হয়নি। ফটক মেরামতের জন্য কয়েকবার গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি বলে দাবি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের।

নিরাপত্তা চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছেও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি বর্তমানে খুলনার বাইরে আছি। জাদুঘরটি কবে থেকে বন্ধ, তা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানাব।’

অন্যদিকে আর্থিক সংকটের কারণে জাদুঘরের ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ১৪ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাঁটাই হওয়া কয়েকজন পরে জাদুঘরে আবার ভাঙচুর চালান বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। গত ১১ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি গণহত্যা ও নির্যাতনের নিদর্শন সংরক্ষণ, বধ্যভূমি ও গণকবরসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং গবেষণার কাজ করছে।

শুরুতে খুলনা নগরের শেরেবাংলা রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে আর্কাইভ ও জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৫ সালে সরকার নগরের ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডে জমিসহ একটি বাড়ি জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দ দেয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে সেখানে প্রায় ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়তলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। খুলনার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

বর্তমানে জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও শহীদদের চিঠিসহ ১৯২ ধরনের নিদর্শন রয়েছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাড়ে তিন শতাধিক ছবি। আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে ১০ হাজারের বেশি ছবি ও প্রায় দুই হাজার ভিডিও। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য নথিও রয়েছে সেখানে।

জাদুঘরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গণহত্যা জাদুঘর আমাদের অনেক আবেগের প্রতিষ্ঠান। প্রধান ফটকটি মেরামত না হওয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে জাদুঘরটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। এ জন্য কয়েকবার গণপূর্ত অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি বিষয়টি নিয়ে চেষ্টা করছেন। হয়তো ইতিবাচক কোনো বার্তা আসবে।’

জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ভূতত্ত্ববিদ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গণহত্যা জাদুঘরে মূলত চার ধরনের কাজ হয়—সংগ্রহ, প্রকাশনা, গবেষণা ও প্রদর্শনী। এর মধ্যে প্রথম তিনটি কাজ কিছুটা চললেও পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার হওয়ায় জাদুঘরের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম প্রদর্শনী গত ২৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জাদুঘরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা ছাড়া জাদুঘরটি চালু করা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা আগেও নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। এখন আশাবাদী যে ভালো কিছু হবে। তবে কবে নাগাদ জাদুঘরটি চালু করা সম্ভব হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’

Related Articles

Latest Posts