তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই ঋণের চাপ, প্রথম বছরেই শোধ করতে হবে ২২০০ কোটি টাকা

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত তৃতীয় টার্মিনাল এখনো চালু হয়নি। অথচ আগামী মাস থেকেই এ প্রকল্পের জন্য নেওয়া বিপুল বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক)।

প্রথম বছরেই প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, যা বেবিচকের গড় বার্ষিক উদ্বৃত্তের প্রায় পুরোটা গিলে ফেলবে। অথচ টার্মিনালটি থেকে রাজস্ব আয় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই ২০২৭ সালের আগে। ফলে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে সংস্থাটি।

২০২৩ সাল থেকেই এই ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরুর কথা ছিল। তবে বেবিচক তিন বছরের স্থগিত সুবিধা পেয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে আগামী মাসে।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান জানান, প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার জাপানি ঋণের বিপরীতে আগামী জুনে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে আরও ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

প্রথম বছরের এই ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার কিস্তি দিতে গিয়ে বেবিচকের প্রায় পুরো বার্ষিক উদ্বৃত্তই শেষ হয়ে যাবে। যদিও দুই বছর পর বার্ষিক কিস্তির পরিমাণ কমে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসবে এবং ২০৫৬ সাল পর্যন্ত তা পরিশোধ চলবে, তবু তাৎক্ষণিক চাপটিকে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতে এখন বেবিচককে সঞ্চয়ে হাত দিতে হতে পারে। এতে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা আধুনিকায়ন এবং নেভিগেশন ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সংগ্রহের কার্যক্রম চাপের মুখে পড়তে পারে।

লাবলুর রহমান বলেন, বেবিচক ঋণের কিস্তির অর্থ অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেবে, পরে সেখান থেকে তা জাপানি কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করা হবে।

এই পরিস্থিতি একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—বাংলাদেশে বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় দ্রুত বাড়লেও সেগুলো থেকে আয় শুরু হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে প্রকল্প চালুর আগেই ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হলেও ২০২৪ সালের মধ্যে এটি চালুর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। মূল জট তৈরি হয়েছে টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে বেবিচক এবং জাপানি কনসোরটিয়ামের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায়।

এই কনসোরটিয়ামের সদস্য হচ্ছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিটোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন।

বেবিচক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তি আলোচনায় অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত মার্চ থেকে আবার আলোচনা জোরদার হয়েছে।

২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেবিচকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান মনে করেন, আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিতে তখনকার প্রশাসনের সক্ষমতার ঘাটতি ছিল।

তবে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিন দাবি করেন, তাদের সময়ও সমঝোতায় পৌঁছাতে একাধিক দফায় নিবিড় আলোচনা হয়েছিল।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, টার্মিনালের নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই ব্যবস্থাপনা চুক্তি চূড়ান্ত করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, সেটা করা গেলে থার্ড টার্মিনালের নিজস্ব আয় থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হতো।

তবে এখন চুক্তি হলেও দ্রুত রাজস্ব আয় শুরু হওয়ার সুযোগ নেই।

সম্প্রতি বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে।

এরপর ‘অপারেশনাল রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার’ (ওআরএটি) নামে বাধ্যতামূলক পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় আরও ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগবে। ফলে টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ উদ্বোধন ২০২৭ সালের আগে সম্ভব হচ্ছে না।

বিমানবন্দরের এই ঋণ দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের দ্রুত বৃদ্ধির চিত্রও সামনে আনছে। তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২ সালের জুনে যা ছিল ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা, তা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকায়।

একই সময়ে দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ ছাড়ের গতিও ছিল ধীর। পুরো বছরের বাজেট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১১ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছে এই সময়ে।

এদিকে, দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে জাপান এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশীদার। দেশের মোট বৈদেশিক দ্বিপাক্ষিক ঋণের ১৮ শতাংশই জাপানের।

বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ২২ শতাংশ জাপানি ইয়েনে হওয়ায় ইয়েনের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঋণ পরিশোধের প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মোট ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালটি তৈরি করেছে অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোরটিয়াম—যার সদস্য মিতসুবিশি করপোরেশন, ফুজিটা করপোরেশন ও স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার টার্মিনালটির সীমিত উদ্বোধন করেছিল।

২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি বহির্গমন ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি আগমন ইমিগ্রেশন ডেস্ক ও তিনটি ভিআইপি ইমিগ্রেশন ডেস্ক।

টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বর্তমানের ৮০ লাখ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়বে। একইভাবে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও ৫ লাখ টনের বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

 

 

Related Articles

Latest Posts