ট্রাম্প কেন নীরব, এখন কী হবে?

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বহুল প্রত্যাশিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনা শেষ হয়েছে কোনো চুক্তি ছাড়াই। প্রায় ২১ ঘণ্টার টানা বৈঠকের পর উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদল দেশটি ত্যাগ করেছে।

আলোচনার এই ভাঙন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে এর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীরবতা, যা কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই বৈঠক ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি সংলাপ। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা এবং বৃহত্তর শান্তি চুক্তির পথ তৈরি করাই ছিল আলোচনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে চেয়েছিল, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইরান সেই প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরে।

এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাবি আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে। ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ সম্পদ মুক্ত করা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বজায় রাখার দাবি জানায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির বিপরীতে নিরাপত্তা, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর ওপর জোর দেয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

ফলে দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই দূরে সরে যায় যে, শেষ পর্যন্ত আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এবং কৌশলগত বিভাজনও এই ব্যর্থতার বড় কারণ।

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীরবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচনার আগে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, আলোচনায় ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে।

তবে আলোচনার পর তিনি সরাসরি কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেননি। বরং এর আগেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ‘প্ল্যান বি’ নেই, অর্থাৎ আলোচনার বাইরে বিকল্প কৌশল খুব সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নীরবতা কৌশলগতও হতে পারে। একদিকে তিনি সামরিক চাপ বজায় রাখতে চান, অন্যদিকে কূটনৈতিক দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছেন না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, আলোচনার ব্যর্থতা তার প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হওয়ায় তিনি অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

প্রথমত, যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইসলামাবাদের আলোচনার আগে যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।

দ্বিতীয়ত, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক তৎপরতা জোরদারের ইঙ্গিত দিয়েছে, আর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অবস্থানে রয়েছে।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হওয়ায় সেখানে অস্থিরতা বাড়লে তেলের বাজারেও চাপ তৈরি হবে।

চতুর্থত, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে যায়নি। পাকিস্তান ইতোমধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং ইরানও বলেছে ‘কূটনীতি শেষ হয়ে যায়নি’।

সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই ব্যর্থ আলোচনা আবারও প্রমাণ করল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব কেবল একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস, এই সবকিছুর জটিল সমন্বয়ই শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের কৌশলগত নীরবতা, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে, এই অচলাবস্থা কি নতুন সংঘাতের দিকে যাবে, নাকি আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরবে দুই পক্ষ।

Related Articles

Latest Posts