ট্রাম্পের অবরোধ ‘বাজি’: ইরান যুদ্ধের ভিন্ন মোড়, নাকি চুক্তির নতুন শর্ত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধের আদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ এখন সামরিক পথ থেকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ দিকে মোড় নিচ্ছে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের এই পরিবর্তন মূলত নতুন করে কোনো বড় ধরনের হামলা ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রচেষ্টা বলে এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ সিদ্ধান্তের পর ইরান তেল রপ্তানি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে বাধার মুখে পড়বে। এতে দেশটি এমন ধ্বংসাত্মক আর্থিক ও মানবিক পরিণতির মুখোমুখি হবে যে, হয়ত শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া ইরানের আর কোনো পথ থাকবে না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই অবরোধের ‘বাজি’ একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ—যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই পশ্চিমা হিসাব-নিকাশ কাজ করে না।

বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতি দ্রুত ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি খাদ্য সংকট, অতি-মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতও সংকটে পড়তে পারে। 
ইরান যদি হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করে, তবে ট্রাম্প নৌ-কৌশল ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দিতে পারেন।

কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এসব যুক্তি এমন ধারণার ওপর দাঁড়ানো যা বারবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করছে, অবরোধের কারণে চরম দুর্দশা এড়াতে ইরানের নেতারা তাদের শর্তে ছাড় দেবেন।

এমন পরিকল্পনার পেছনে আরেকটি একটি প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, চরম অর্থনৈতিক অবনতি ইরানে নতুন করে জনঅসন্তোষ তৈরি করতে পারে এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বোমা হামলায় ইরানের দেশটি পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

কিন্তু ইরানের নেতারা বিষয়টিকে একইভাবে দেখবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য

অবরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির বড় ক্ষতি হওয়ার আগে ইরানের আচরণের কি পরিবর্তন হবে? যদি তা না হয়, তবে ট্রাম্পের এই নতুন সিদ্ধান্ত নিজের জন্যই একটি রাজনৈতিক ফাঁদে পরিণত হতে পারে এবং রিপাবলিকান পার্টির মিড-টার্ম নির্বাচনের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

আজ বৃহস্পতিবার পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রাখবে।

ট্রাম্পের অন্যান্য সিদ্ধান্তের মতো এই অবরোধের আকস্মিক সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের কাছে অস্পষ্ট মনে হতে পারে।

 

সিএনএনের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক স্টিভেন কলিনসনের মতে, এটি বাস্তবসম্মত সামরিক সিদ্ধান্ত। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। এর আগে যুগোশ্লোভিয়া, হাইতি এবং অতি সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পতনের আগে ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকারের বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকর করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসির (এফডিডি) একটি বিশ্লেষণ বলছে, বিমান ও স্থল সেনাদের সহায়তায় হরমুজ প্রণালির বাইরে মার্কিন জাহাজ দিয়ে এই অবরোধ কার্যকর করা হতে পারে।

এফডিডির সিনিয়র ফেলো মিয়াদ মালেকির বক্তব্য, এই অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তাদের বেশিরভাগ বাণিজ্য বন্ধ করতে পারে এবং কয়েক দিনের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা সংকট তৈরি করতে পারে।

ইরানের বার্ষিক ১০৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা-যাওয়া করে। এ কারণে এই অবরোধের ঝুঁকির মুখেই রয়েছে ইরান।

পাশাপাশি, ইরান তেল রপ্তানি করতে না পারলে মজুত করার জায়গা না থাকায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে।

ইরানের দৃঢ়তা

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকার ইতোমধ্যে জনগণের দুর্ভোগের প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, রাজনৈতিক দমন-পীড়নে হাজারো মানুষের মৃত্যু হলেও ইরান সরকার পিছু হটেনি।

এছাড়া, যুদ্ধে অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হলেও শাসনব্যাবস্থা টিকে যাওয়া প্রমাণ করে যে, এই শাসকগোষ্ঠী অনেক বেশি দৃঢ়।

 

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র এবারও ইরানের দৃঢ়তাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে না। বিশেষ করে, এ যুদ্ধকে ইরানের নেতারা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে যেভাবে দেখছেন, সেটা ট্রাম্প প্রশাসন হয়ত আমলে নিচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক বিষয়ক সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত ডেভিড স্যাটারফিল্ড বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানিরা বিশ্বাস করে তারা পরিস্থিতি সামলাতে পারবে। ওয়াশিংটন ইরানের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানিদের বিশ্বাস তারা তাদের প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি সময় ধরে বেশি যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।’

সিএনএনসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্পের ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান হরমুজ প্রণালি আটকে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক আগেই যুদ্ধে ইতি টানবে।

এ কারণে, মার্কিন অবরোধের ফলাফলও এখন সময়ের ওপর নির্ভর করছে।

পাল্টা কৌশল

এই অবরোধ ইরানের সামনে নতুন কৌশলগত ধাঁধা তৈরি করেছে। উত্তেজনা বৃদ্ধির বিকল্পগুলো তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে।

তবে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর পুনরায় হামলা চালিয়ে এর জবাব দিতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস সিএনএনকে বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে ইরানকে বড়সড় আঘাত করা গেছে। কিন্তু আমরা এখনো তাদের অর্থনীতিকে পুরোপুরি বন্ধ করতে পারিনি। এ কারণেই তারা হয়ত মনে করছে যে তাদের হাতে এখনো কিছু পন্থা বাকি আছে।’

যেমন, একটি বিকল্প হলো ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বিকল্প তেল পরিবহন রুট বন্ধ করে দেওয়া। এমন পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে এবং ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই অবরোধ আরেকটি কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। সেটি হলো—এর ফলে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে, যারা ইরান থেকে তেল কেনে।

মার্কিন বাহিনী যদি ইরানগামী কোনো চীনা জাহাজ আটক করে, তবে তা বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে একটি বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

চুক্তির সম্ভাবনা

গত সপ্তাহে পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রথম দফা ব্যর্থ হওয়ার পর হোয়াইট হাউস আশাবাদী এ কারণে যে, অবরোধ ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরাতে বাধ্য করবে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ইতোমধ্যে বলেছেন, ‘আমরা ইতিবাচকভাবে একটি চুক্তির সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।’

কিন্তু মার্কিন প্রশাসন ইরানকে চুক্তির বিষয়ে আগ্রহী হিসেবে দেখালেও বাস্তবে এর প্রমাণ মিলছে না।

আজ পিট হেগসেথ পেন্টাগনে ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তেহরান কোনো চুক্তিতে না এলে নতুন করে হামলা চালানো হতে পারে।

ইউক্রেন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায়ই অর্থনৈতিক লাভের কথা বলেছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

পাকিস্তান বৈঠকে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান বিপরীতমুখী।

ওয়াশিংটন চায় ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে।

অন্যদিকে ইরান ক্ষতিপূরণ দাবি করছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার তাত্ত্বিক অধিকার বজায় রাখতে লড়াই করছে।

তবে চুক্তির বিষয়ে অস্পষ্ট হলেও একটি রূপরেখা ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার রাতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে ফোনালাপের পর এ দুই দেশের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ওয়াশিংটন ২০ বছরের জন্য ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে। হয়ত মাঝামাঝি কোনো সময়ের জন্য সমঝোতা হতে পারে।

সফল শান্তি স্থাপনের জন্য প্রতিটি পক্ষকে এমন একটি সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে যেখানে সবার স্বার্থ ও লক্ষ্য পূরণ হবে এবং প্রতিটি দেশ নিজের ‘জয়’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

তবে, এটি করতে বেশ কয়েকমাস লেগে যেতে পারে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ে গভীর আলোচনার প্রয়োজন হবে। এর জন্য সব পক্ষের ধৈর্য ধরতে হবে যা এই কূটনীতিতে এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত।

এ অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অবরোধের ঘোষণাকে ‘বাজি’ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় সামরিক সংঘাতের বাইরে এটি এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ‘অবরোধ যুদ্ধে’ রূপান্তরিত হয়েছে, যার মাঝে আটকা পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি।

Related Articles

Latest Posts