জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এই বার্তাই দিচ্ছে যে সরকারের পক্ষে আর বাড়তি খরচ সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত এখন অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আছড়ে পড়ছে।
ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে সরকার কার্যত এটাই স্বীকার করে নিল যে, জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বিশাল বোঝা বহন করা এখন আর সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদরা এই পদক্ষেপকে একটি প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে স্বাগত জানালেও এর ফলে সরাসরি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা যে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, এই সিদ্ধান্তটি সেই চরম সত্যকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজার এরইমধ্যে এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের জন্য সহনশীল পর্যায়ে রাখতে বাংলাদেশ এতদিন ধরে আমদানি দামের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করে আসছিল।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল কিনতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। দাম সামান্য বাড়িয়ে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই দাম সমন্বয় মূলত ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং সরকারের সীমিত নীতিগত বিকল্পেরই প্রতিফলন।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেবে। একইসঙ্গে পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেবে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অত্যন্ত সতর্ক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। তার মতে, ভর্তুকির কারণে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয় হচ্ছিল, অন্যদিকে এর সুফল সাধারণ মানুষের চেয়ে সচ্ছল শ্রেণীই বেশি ভোগ করছিল।
তিনি বলেন, দাম সমন্বয় করা না হলে ভর্তুকির অর্থ জোগাতে সরকারকে হয় কর বাড়াতে হতো, না হয় ঋণ নিতে হতো অথবা অন্যান্য খাতের বরাদ্দ কমিয়ে দিতে হতো—যার প্রতিটিই সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনত।
জাহিদ হোসেন যুক্তি দেখান, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করার ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে লোকসানের মুখে পড়ে, তার চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরই বর্তায়।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কৃত্রিমভাবে দাম কম রাখলে প্রায়ই বাজারে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ সারি এবং কালোবাজারি বেড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের বড় পার্থক্যের কারণে চোরাচালানকে উৎসাহিত করা হয়; এর ফলে বাংলাদেশের ভর্তুকি দেওয়া জ্বালানির সুবিধা ভোগ করে ভিনদেশের মানুষ।
নিম্নআয়ের ও অসহায় পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে তিনি সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা (ক্যাশ ট্রান্সফার) বা ভাউচারের মতো সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রদানের পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বজুড়ে সরাসরি আর্থিক সহায়তার সফল উদাহরণগুলো তুলে ধরেন।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশি থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয়ে দেরি করলে তা ভবিষ্যতে আরও বেশি ভোগান্তি তৈরি করবে এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক এবং এটি আরও আগেই কার্যকর করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে ভর্তুকির বিশাল বোঝা বিবেচনায় নিলে এই নেতিবাচক প্রভাব এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না।
ম. তামিম উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ ধারণা করেছিল যে দাম সমন্বয় করা হবে আগামী মাসে। এই আশঙ্কায় তারা আতঙ্কিত হয়ে তড়িঘড়ি করে তেল কেনার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।
তাছাড়া, সরকার আগেভাগেই দাম বাড়ানোর আভাস দেওয়ায় এবং কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে রাখায় বাজারে মজুতদারি ও কালোবাজারি বেড়ে গেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মাসের মাঝামাঝি সময়ে দাম বাড়ানো হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের নিজস্ব নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকার তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু বেসরকারি সরবরাহকারীর মজুতদারির বিষয়টি এখন স্পষ্ট। কারণ দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বেড়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) রাষ্ট্রীয় তিন বিতরণকারী সংস্থা—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে গত বছরের তুলনায় ডিজেল ও পেট্রোলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের এপ্রিলে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার ৮৬২ টন ডিজেল, এক হাজার ১৮৫ টন অকটেন এবং এক হাজার ৩৭৪ টন পেট্রোল সরবরাহ করা হয়েছিল।
চলতি বছরের ১ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান দামের প্রেক্ষাপটে দৈনিক গড় ডিজেল সরবরাহ কমিয়ে ১১ হাজার ১০৭ টন, অকটেন এক হাজার ১২৯ টন এবং পেট্রোল এক হাজার ২৫৩ টনে নামিয়ে আনা হয়। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়।
তবে এপ্রিলের প্রথম ১৭ দিনের তুলনায় আজ থেকে ডিজেলের সরবরাহ ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৪৮ টন, অকটেন ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ৪২২ টন এবং পেট্রোল ২০ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ৫১১ টনে উন্নীত করা হচ্ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশ্ন তোলেন, দেশে উৎপাদিত পেট্রোল ও অকটেনের দাম কেন আমদানিকৃত জ্বালানির দামের সমান রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই নানা কারসাজি চালিয়ে আসছে। অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকার নিজেই এখন ফাঁদে পড়েছে, আর বিতরণকারী কোম্পানিগুলো এই সুযোগে অতি-মুনাফা লুটছে।
তার মতে, বিতরণকারী কোম্পানিগুলো ভোক্তাদের পকেট থেকে আসা মুনাফা দিয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়াচ্ছে এবং বোনাস দিচ্ছে; অথচ এই বাড়তি খরচগুলো জ্বালানির দামের ভেতরেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না করে সরকার তার পূর্বসূরিদের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করছে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান কৃষি খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন, বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুমে যখন সেচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। তিনি জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘ লাইনের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ানো সেচ থেকে শুরু করে ফসল কাটা, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ—অর্থাৎ কৃষিপণ্যের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন কমে গেলে পুনরায় চাল আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া গ্যাস সংকটে সারের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, এখন ফসলের বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, কিন্তু জ্বালানি সংকটে মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ওপর কেরোসিনের দাম বাড়ায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর চাপের বোঝা আরও ভারী হবে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক ও নৌপথ—উভয় খাতেই যাতায়াত ভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
গণপরিবহনের ভাড়া পুনঃনির্ধারণের লক্ষ্যে গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) একটি সভা করেছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভাড়ার নতুন হার নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
পরিবহন মালিক সমিতিগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা মহানগরে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৪ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করার প্রস্তাব দিতে পারে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে মহানগর এলাকায় যাতায়াত ভাড়া সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবে সর্বনিম্ন ভাড়াও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

