জিনেট ভান তাসেল: ঢাকার আকাশে প্রথম উড়েছিলেন যে নারী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—‘আকাশে তো আমি রাখি নাই মোর/ উড়িবার ইতিহাস।/ তবু, উড়েছিনু এই মোর উল্লাস।’

কদিন আগে এক বিকালে পুরান ঢাকার অলিগলি পেরিয়ে গিয়েছিলাম নারিন্দার ‘ঢাকা খ্রিস্টান কবরস্থানে’। তখন শতবর্ষ আগে প্রয়াত এক নারীকে স্মরণ করে কবিগুরুর লেখা এই কবিতা মনে পড়ে যায়। বাংলার প্রথম আকাশচারী জিনেট ভান তাসেল।

১৬০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ারী খ্রিষ্টান সিমেট্রির ভেতরে সারি সারি পুরোনো সমাধি, এর মধ্যে অনেকগুলোই শতবর্ষ পুরোনো। কোনোটাতে পাথরে খোদাই করে নাম লেখা, কোনোটায় সিমেন্টের স্মৃতিফলক। এরই মধ্যে পড়ে আছে জরাজীর্ণ, প্রায় বিস্মৃত একটি সমাধি। নেই কোনো নামফলক, নেই পরিচয়ের কোনো চিহ্ন। অথচ এখানেই শুয়ে আছেন ঢাকার ইতিহাসের বিস্ময়কর এক অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র—জিনেট ভান তাসেল।

আজকের দিনে বিমান, হেলিকপ্টার, প্যারাসুট কিংবা বেলুনে আকাশে ওড়ার দৃশ্য আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যখন প্রথম আকাশে ওড়ার চেষ্টা করছিল, সেই সময়ের গল্প ছিল একেবারেই অন্যরকম। রোমাঞ্চ ছিল, ছিল বিস্ময়, আর তার সঙ্গে ছিল ভয়াবহ ঝুঁকি। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ঢাকায়।

১৮৯২ সালের ১৬ মার্চ। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকার মানুষ সেদিন এমন এক দৃশ্য দেখেছিল, যা তখনকার পৃথিবীর এই অংশে প্রায় কল্পনাই করা যেত না। ২৪ বছর বয়সী একজন মানুষ, তাও আবার বিদেশিনী, বেলুনে চড়ে আকাশে উড়বেন। তারপর প্যারাসুট নিয়ে নেমে আসবেন নিচে। আকাশে মানুষ উড়তে পারে, এই ধারণাটাই তখন অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য।

অভিনব এই দৃশ্য দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ে। সেই সাহসী মানুষটি ছিলেন আমেরিকান আকাশচারী জিনেট ভান তাসেল। ঢাকার আকাশে তার সেই উড়ান শেষ হয়েছিল দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। এই দুর্ঘটনা ঢাকার ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক গল্পগুলোর একটি।

আকাশে মানুষকে উড়তে দেখার সেই আয়োজন করেছিলেন ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহ। ১৮৯২ সালে তিনি ‘নবাব বাহাদুর’ উপাধি পান। আর সেই অর্জন ঘিরেই ছিল প্রদর্শনীটি। 

সেই সময় কলকাতায় ছিলেন পার্ক ভ্যান তাসেল ও তার দল। বেলুনে উড়ে প্রদর্শনী দেখানো ছিল তাদের পেশা। দলের অন্যতম আকর্ষণ জিনেট।

নবাব আহসানউল্লাহর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেন জার্মান ফটোগ্রাফার ফ্রিৎজ ক্যাপ। এরপর ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঢাকায় বেলুনে উড়বার প্রদর্শনীর চুক্তি হয়। টাকার অঙ্কটা তখনকার সময়ে বিশাল ছিল। 

তারপর ঢাকাজুড়ে শুরু হলো প্রচার। ঢোল পিটিয়ে মানুষকে জানানো হলো, একজন বিদেশিনী বেলুনে চড়ে আকাশে উড়বেন। মানুষের আগ্রহ তখন তুঙ্গে।

১৬ মার্চ, ১৮৯২। বিকেল বেলা। বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ে মানুষের ঢল নামে সেদিন। নদীর ওপর নৌকা। নদীর ধারে মানুষ। আশপাশের বাড়ির ছাদে মানুষ। আহসান মঞ্জিলের প্রাঙ্গণ ও ছাদেও উৎসুক দর্শক।

বেলুন ফুলতে শুরু করল বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে। কেরোসিন দিয়ে কাঠ জ্বালিয়ে গরম ধোঁয়া ঢোকানো হয় বেলুনে। সিলেটের মরমী কবি ও গীত-রচয়িতা হাছন রাজার নাতি গণিউর রাজার লেখা দিনপঞ্জিতে এর বর্ণনা পাওয়া যায়।

জিনেটের বেলুন থেকে নামার কথা ছিল আহসান মঞ্জিলের ছাদে। নবাব বাড়ির পর্দানশীন নারীরা তো আর বাইরে গিয়ে সাধারণ জনতার কাতারে নেমে এই আয়োজন দেখতে পারেন না! তাই নবাবের নির্দেশেই ওই গন্তব্য ঠিক হলো। ইচ্ছা না থাকলেও বাড়তি পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত সেই গন্তব্যে প্যারাসুটের সাহায্যে নামতে রাজি হন জিনেট।

সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে বেলুনের দড়ি ছেড়ে দেওয়া হলো। বেলুন ওপরে উঠতে শুরু করল। নিচে তখন অসংখ্য মানুষের উল্লাস।

সেদিনের এই উড্ডয়নকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম নথিবদ্ধ মানুষবাহী বেলুনযাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গণিউর রাজার ভাষায়, ‘সেই আকাশচারী নারী এত উঁচুতে উঠেছিলেন, যেখানে চিল-শকুনদের দেখা যায়।’

জিনেট তখন বেলুনের নিচে ঝোলানো ছোট কাঠের পাটাতনে। বেলুন আকাশে উছে তো উঠছেই। এক বর্ণনায় বেলুনটি প্রায় ছয় হাজার ফুট উঁচুতে উঠেছিল বলা হয়েছে।

সেদিন সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। দক্ষিণ দিক থেকে জোর বাতাস বইছিল। এর আগেও বহুবার নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জিনেট বেলুন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু সেটাই যে তার জীবনের শেষ প্রদর্শনী হবে, তা তখন কেউ জানত না।

বেলুন ভেসে যেতে লাগল অন্যদিকে। আহসান মঞ্জিল পার হয়ে আরও দূরে। শেষ পর্যন্ত জিনেটকে সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তিনি প্যারাসুট নিয়ে বেলুন থেকে ঝাঁপ দিলেন। ঢাকার ওই ঝাঁপটি ছিল তার ৪১তম প্যারাসুট অবতরণ।

প্যারাসুট খোলার পর জিনেটকে বাতাস টেনে নিয়ে যেতে লাগল উত্তরের দিকে। নিচে তখন মানুষ ছুটছে। যেদিকে জিনেট যাচ্ছেন, মানুষও সেদিকে দৌড়াচ্ছে। কেউ জানে না শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে তিনি নামবেন।

অবশেষে জিনেট একটা গাছের সঙ্গে আটকে গেলেন। এলাকাটা ছিল জনমানবহীন। নবাব পরিবারের বাগান ও জঙ্গলঘেরা অঞ্চলের অংশ ছিল ওই এলাকা। বিভিন্ন বর্ণনায় জায়গাটিকে বর্তমান শাহবাগ, রমনা বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কাছাকাছি বলে অনুমান করা হয়। জিনেট তখনও জীবিত ছিলেন।

জিনেটকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। একজন ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।

জিনেটকে নিচে নামানোর জন্য বাঁশ আনা হলো। তিনি তা ধরে নামতে চাইছিলেন না, অন্য সরঞ্জাম আনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইলেন। কারণ তিনি যে উচ্চতায় আটকে ছিলেন, সেখান থেকে পড়ে গেলে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু পুলিশ তাকে বারবার নিচে নামতে বলছিল। শেষ পর্যন্ত বাঁশের সাহায্যেই তাকে নামানোর চেষ্টা করা হয়।

আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। বাঁশ ভেঙে গিয়ে জিনেট নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুদিন পর ১৮ মার্চ তিনি মারা যান।

জিনেটের মৃত্যু ঢাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয় মানুষের একাংশ এই দুর্ঘটনার জন্য উদ্ধার তৎপরতার ব্যর্থতাকে দায়ী করেছিলেন। অন্যদিকে ইংরেজি পত্রিকায় ভিন্ন অবস্থানও প্রকাশিত হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল ঢাকাবাসীর বিরুদ্ধে।

জিনেটের পরিবারের পক্ষ থেকেও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল বলে একটা বর্ণনায় পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ঘটনা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়।

জিনেটকে সমাহিত করা হয় নারিন্দার পুরোনো খ্রিষ্টান কবরস্থানে।

জিনেটের পরিচয় নিয়েও দীর্ঘদিন ছিল ধোঁয়াশা। গণিউর রাজার ভ্রমণকাহিনীতে তার বয়স ১৫ বা ১৬ বছর বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে পুরান ঢাকার সেন্ট থমাস গির্জার পুরোনো মৃত্যুর নিবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে তার বয়স ২৪ বছর এবং পেশা হিসেবে আকাশচারী বা অ্যারোনট উল্লেখ ছিল।

তার পারিবারিক পরিচয় নিয়েও পুরোনো সূত্রে একাধিক মত পাওয়া যায়। একটি গবেষণায় বলা হয়, জিনেট আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাটিতে জন্মেছিলেন। বিয়ের আগে তার নাম ছিল জিনেট রুমারি।

বাবার নাম জর্জ জন রুমারি। মায়ের নাম জেন টিংলে। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। 

তবে তার পারিবারিক পরিচয়, পার্ক ভ্যান তাসেলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দলের অন্য সদস্যদের পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে।

কোথাও তাকে পার্ক ভ্যান তাসেলের স্ত্রী বলা হয়েছে। কোথাও তাকে তার দলের সদস্য বলা হয়েছে। আবার ‘ভ্যান তাসেল’ নামটি দলের সদস্যদের পেশাগত নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো, এমন দাবিও রয়েছে। তাই জিনেটের জীবনের সব তথ্য আজও এক সূত্রে বাঁধা যায়নি।

তার ছবি নিয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই। জিনেটের নামে যে ছবি দীর্ঘদিন প্রচারিত হয়েছে, সেটা আসলে তার নিজের ছবি কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, জিনেট ছিলেন পেশাদার আকাশচারী এবং ভ্যান তাসেল দলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বেলুন প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন।

জিনেটের বিস্মৃত ইতিহাস ফিরিয়ে আনার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে গবেষক ও স্থপতি শামীম আমিনুর রহমানের। সিলেটের গণিউর রাজার ঢাকা ভ্রমণের বিবরণ থেকে তিনি প্রথম এই ঘটনার সন্ধান পান বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান।

তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালে ঢাকার নবাব পরিবারের বংশধর খাজা হালিমের কাছে থাকা একটা পুরোনো ছবির সন্ধান পাই আমি। ছবিতে একটা অর্ধস্ফীত বিশাল বেলুন আর তার চারপাশে অনেক মানুষ দেখি। এরপর ছবিটা গণিউর রাজার বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। এভাবে অনুসন্ধান আরও এগোতে থাকি। 

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পুরান ঢাকার সেন্ট থমাস চার্চের পুরোনো মৃত্যুনিবন্ধন খোঁজা হয়। সেখানেই পাওয়া যায় জিনেটের নাম, বয়স, পেশা আর তার মৃত্যুর তারিখ।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি বিভাগে সংরক্ষিত পুরোনো সংবাদপত্রের মাইক্রোফিল্ম ঘেঁটে ঘটনার আরও তথ্য বের করেন তিনি। ১৮৯২ সালের ১৯ মার্চ ‘বেঙ্গল টাইমস’-এ জিনেটের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানান তিনি।

২০০০ সালে শামীম আমিনুর রহমান এই ঘটনা নিয়ে তার গবেষণাগ্রন্থ ‘ঢাকার প্রথম আকাশচারী ভান তাসেল’ প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে বহু বছর পর জিনেট ভান তাসেলের গল্প আবারও মানুষের সামনে আসে।

Related Articles

Latest Posts