জাল প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানির পরিবর্তে তা খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের বন্ডভুক্ত তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্যানটেক্স নিটওয়্যারস লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।
বন্ড কমিশনারেটের তদন্তে দেখা গেছে, গত দুই বছরে কমিশনারেটের চারটি প্রত্যয়নপত্র জাল করে এফওসি সুবিধায় প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩৩২ টন ফেব্রিক আমদানি করেছে স্যানটেক্স নিটওয়্যারস। আমদানি ও রপ্তানির নথিপত্র যাচাইয়ে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর চলতি মাসের মাঝামাঝিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়।
একই অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের আরেক বন্ডভুক্ত প্রতিষ্ঠান ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা গত ২১ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শনে প্রমাণ পান, প্রতিষ্ঠানটি আল ইয়াসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে জাল সাব-কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে এফওসি সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১৯ টন কাপড় কারখানা থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, এফওসি ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরাসরি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের কাছে পাঠাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রয়োজন হয় না ও কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকে। তবে শর্ত হলো—ওই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য একই ক্রেতার কাছেই রপ্তানি করতে হবে।
কিন্তু কিছু অসাধু বন্ডভুক্ত প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। এতে সরকার শুল্ক রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য আমদানি করা বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মো. জাকির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এফওসি সুবিধার অপব্যবহার ও বন্ড কমিশনারেটের প্রত্যয়নপত্র জাল করার প্রমাণ পাওয়ায় স্যানটেক্স নিটওয়্যারসের বিরুদ্ধে বন্ড লাইসেন্স বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
‘একইভাবে জাল সাব-কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে বন্ডেড পণ্য অবৈধভাবে অপসারণের অভিযোগে ফোকাস অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে’, বলেন তিনি।
জাকির হোসেন বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও রপ্তানি সহজ করতে এফওসি সুবিধা চালু করা হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান এর অপব্যবহার করছে। চট্টগ্রামে এফওসি সুবিধায় আমদানি করা ৪০ থেকে ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানির পর মজুত যাচাই, কাটিং তদারকিসহ ১০টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যেন কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ না থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে স্যানটেক্স নিটওয়্যারসের হেড অব কমার্শিয়াল গিয়াস উদ্দিন মাসুদ ডেইলি স্টারকে বলেন, এফওসি ছাড়াও আমরা এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানি করি। কাস্টমস ও বন্ড-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের পরিচিত একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করেছিলাম। তিনি আমাদের জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেছেন। এখন তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক এ কে এম আলমগীর বর্তমানে বিদেশে আছেন। বন্ড কমিশনারেটের সব নোটিশ ও জিজ্ঞাসার জবাব তিনিই দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, ফোকাস অ্যাপারেলসের কমার্শিয়াল ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহিন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, এফওসি সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে প্রত্যয়নপত্রের পাশাপাশি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ইউটিলিটি ডিক্লারেশন (ইউডি) যাচাই করা হচ্ছে। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাঁচামালের কাটিং ও ব্যবহারও সরেজমিনে তদারকি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাস্টমসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জাল সাব-কন্ট্রাক্ট, জাল প্রত্যয়নপত্র ও ভুয়া রপ্তানির মাধ্যমে এফওসি সুবিধা অপব্যবহারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
কাস্টমস সূত্র জানায়, চলমান তদন্তে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তদন্ত শেষ হলে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ড লাইসেন্স বাতিল, শুল্ক-কর আদায় ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে।

