ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পাশাপাশি উত্তর জাপানের উপকূলেও আজ বৃহস্পতিবার সকালে ৭ দশমিক ২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঘরের আসবাবপত্র পড়ে যাওয়া এবং নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলোর তীব্র কাঁপুনির তথ্য পাওয়া গেছে।
এএফপি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে প্রধান দ্বীপ হোনশুর ইওয়াতে প্রিফেকচারের উপকূলীয় সমুদ্রে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর কম্পন রাজধানী টোকিওতেও অনুভূত হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশ মাইল দূরে অবস্থিত। তবে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) প্রথমে ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ দশমিক ৯ বললেও পরে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ২ নির্ধারণ করে। সংস্থাটি জানায়, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৪ কিলোমিটার গভীরে।
উত্তরাঞ্চলের আওমোরি প্রিফেকচারের হাশিকামিতে বসবাসকারী ৬১ বছর বয়সী খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের কর্মী মুতসুমি শিমোহাতা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, তার বাসায় একটি ছবির ফ্রেম পড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ক্ষতি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমি বাসায় থাকাকালীন ভূমিকম্পটি হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আমার স্মার্টফোনে সতর্কবার্তা আসে। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, আর কম্পনটা বেশ কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল বলে মনে হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, তাদের বাড়িতে ক্ষতি না হলেও অফিসের স্বয়ংক্রিয় দরজা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে এবং ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে। এ কারণে কর্তৃপক্ষ কর্মীদের বাসায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
জাপানি টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, রান্নাঘরের আলমারি থেকে হাঁড়ি-পাতিল মেঝেতে পড়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন দোকানের পণ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
ভূমিকম্পের কারণে কিছু শিনকানসেন বুলেট ট্রেনের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। হাশিকামির এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকেকে জানান, ভূমিকম্পের পর স্কুলটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এনএইচকে জানায়, হাশিকামি ও হাচিনোহে এলাকার দমকল বিভাগ অন্তত চারটি জরুরি ফোনকল পেয়েছে। এ ছাড়া, একটি লিফটে কয়েকজন আটকে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও দরজা আটকে যাওয়া এবং একটি ট্যাংকার ট্রাক উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
জাপানের শীর্ষ সরকারি মুখপাত্র মিনোরু কিহারা বলেন, ‘এ মুহূর্তে কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে যাচ্ছি।’
কিয়োদো নিউজের বরাতে দেশটির পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অঞ্চলের কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায়নি।
আওমোরি এলাকায় জাপানের সাত ধাপের শিনদো তীব্রতা স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ‘আপার সিক্স’। জেএমএর তথ্যমতে, এ পর্যায়ের কম্পনে মানুষ সহায়তা ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, আসবাবপত্র উল্টে যেতে পারে এবং জানালার কাচ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সতর্ক থাকার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে, সেখানকার বাসিন্দাদের একই মাত্রার আরও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি জাপান। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর পশ্চিম প্রান্তে চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে প্রতিবছর শত শত ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশ্বে সংঘটিত মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই জাপানে ঘটে।
যদিও অধিকাংশ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে মৃদু, তবে উৎপত্তিস্থল ও গভীরতার ওপর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে।
দেশটি এখনও তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির স্মৃতি বহন করছে। ২০১১ সালে ৯ দশমিক শূন্য মাত্রার সেই সমুদ্রগর্ভস্থ ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন এবং ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চলতি বছরের ২০ এপ্রিল উত্তর জাপানে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পে অন্তত ১০ জন আহত হন এবং টোকিওর বহু উঁচু ভবন কেঁপে ওঠে। এরপর কর্তৃপক্ষ ৮ দশমিক শূন্য বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছিল, যা এক সপ্তাহ পর প্রত্যাহার করা হয়।

