ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও উচ্চ জীবনমানসম্পন্ন দেশ সুইজারল্যান্ড এক অভূতপূর্ব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির জনগণ গণভোটে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে—সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা নির্দিষ্ট একটি সীমার মধ্যে বেঁধে দেওয়া হবে কি না? প্রস্তাবটি পাস হলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ১ কোটির (১০ মিলিয়ন) বেশি হতে পারবে না।
বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জন্মহার কমানো বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি শ্লথ করার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কোনো দেশ সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করবে কি না—এমন ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন।
তাই সুইজারল্যান্ডের এই গণভোট শুধু দেশটির জন্য নয়, বিশ্বের জনসংখ্যা ও অভিবাসননীতি নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রস্তাবে কী আছে?
প্রস্তাবটির পেছনে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের ডানপন্থী সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি)। তারা একে ‘সাসটেইনেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ বা টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করছে।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের আগে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ১ কোটির বেশি হতে পারবে না। জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণে কড়াকড়ি, বিদেশি কর্মীদের জন্য পরিবারিক পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করা, আবাসন অনুমতি বা রেসিডেন্স পারমিট কঠোর করা ও অভিবাসন আরও নিয়ন্ত্রণ করা।
এমনকি এসব ব্যবস্থা নিয়েও যদি জনসংখ্যা ১ কোটির সীমা অতিক্রম করে, তাহলে সুইজারল্যান্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কেন এই প্রস্তাব?
এসভিপির দাবি, নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের কারণে সুইজারল্যান্ড খুব দ্রুত জনবহুল হয়ে উঠছে।
২০০২ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১ লাখে। অর্থাৎ দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ বিদেশি নাগরিক।
প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কয়েকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে—যেমন: আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, যানজট, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড়, স্কুল ও হাসপাতালের ওপর চাপ এবং সামাজিক সেবার ব্যয় বৃদ্ধি।
এসভিপির নেতা ও বার্ন ক্যান্টনের রাজনীতিক নিলস ফিখটার মনে করেন, সুইজারল্যান্ড তার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
তার ভাষায়, ‘নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন সুইজারল্যান্ডকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সুইজারল্যান্ড আর আগের মতো থাকবে না।’
বিরোধীদের আপত্তি
তবে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছে সুইস সরকার, পার্লামেন্টের অধিকাংশ দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অর্থনীতিবিদেরা।
তারা এই উদ্যোগকে ‘কেওস ইনিশিয়েটিভ’ বা বিশৃঙ্খলাপূর্ণ প্রস্তাব বলে অভিহিত করছেন।
বিরোধীদের যুক্তি, আবাসন সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য শুধু অভিবাসীদের দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়।
বার্ন সিটি কাউন্সিলের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক হেলিন জেনিস বলেন, ‘বাড়িভাড়া কে নির্ধারণ করবে, স্বাস্থ্যবিমার খরচ কত হবে বা আবাসন খাতে কত বিনিয়োগ হবে—এসব সিদ্ধান্ত অভিবাসীরা নেয় না।’
তার মতে, সব সমস্যাকে অভিবাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধানের বদলে সমাজে বিভাজন বাড়ে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি অনেকাংশে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল।
দেশটির হোটেল খাতে কর্মরত মানুষের প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী। হাসপাতাল, নার্সিং হোম, নির্মাণ খাত এবং প্রযুক্তি শিল্পেও বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী কাজ করেন।
দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ইকোনমিসুইসের প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রস্তাব পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইইউ বহুদিন ধরেই বলে আসছে, কোনো দেশ ইউরোপের একক বাজারের সুবিধা ভোগ করবে কিন্তু মানুষের অবাধ চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মানবে না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। কিন্তু নানা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তারা ইইউর বাজারে প্রবেশাধিকার পায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জনসংখ্যা সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজনে যদি সুইজারল্যান্ড অবাধ চলাচল চুক্তি বাতিল করে, তাহলে ইইউর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্য দিক
অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য জনপ্রিয় হলেও জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা রয়েছে—দেশটির জন্মহার কমছে এবং জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে।
বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। আগামী কয়েক দশকে এই হার আরও বাড়বে।
এর অর্থ হলো—শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর প্রয়োজন হবে, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো দরকার হবে এবং পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাত সচল রাখতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দরকার হবে।
কিন্তু সুইজারল্যান্ড নিজস্ব জন্মহারের মাধ্যমে সেই প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরি করতে পারছে না। ফলে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন কমিয়ে দিলে শ্রমিক সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
বিশ্বের অন্য কোথাও কি এমন উদ্যোগ আছে?
প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো দেশ কি তার জনসংখ্যার ওপর নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে পারে। তবে বাস্তবে এমন উদাহরণ খুবই বিরল।
চীন একসময় ‘এক-সন্তান নীতি’ চালু করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানো। কিন্তু সেই নীতির কারণে পরে শ্রমশক্তি সংকট, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং নারী-পুরুষের ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত চীন নীতিটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
তবে কোনো দেশ গণভোটের মাধ্যমে সরাসরি বলে দিয়েছে যে তার মোট জনসংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করতে পারবে না—এমন উদাহরণ এখনও নেই।
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ফিলিপ ভ্যানারের মতে, সুইজারল্যান্ডের এই উদ্যোগ বিশ্বে কার্যত নজিরবিহীন।
ভোটের ফল কী হতে পারে?
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লড়াই অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে।
কিছু জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটার এর পক্ষে রয়েছেন। এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন।
সুইজারল্যান্ডের গণভোট পদ্ধতিতে কোনো প্রস্তাব পাস করতে হলে শুধু জনপ্রিয় ভোটে জয়লাভ করলেই হয় না; দেশটির ক্যান্টনগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনও প্রয়োজন হয়।
কেন এই ভোট বিশ্বের নজরে?
এই গণভোট মূলত একটি বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে এনেছে—একটি দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?
সমর্থকদের মতে, জনসংখ্যা সীমিত না করলে আবাসন সংকট, অবকাঠামোর চাপ ও পরিবেশগত সমস্যা আরও বাড়বে।
অন্যদিকে বিরোধীদের যুক্তি, আধুনিক অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করতে অভিবাসন অপরিহার্য। জনসংখ্যার ওপর কৃত্রিম সীমা আরোপ করলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের ভোটাররা যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, এই গণভোট বিশ্বের অনেক দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কারণ অভিবাসন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জাতীয় পরিচয় এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজন—এই চারটি প্রশ্ন আগামী দশকগুলোতে আরও বেশি করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসবে।

