চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি আজ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা-রক্ষণাবেক্ষণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বিদেশিদের কাছে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার এই চুক্তি হতে যাচ্ছে।

প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে পাঁচটি জেটি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টি রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ওঠানামার ৪০ শতাংশের বেশি এই টার্মিনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড টার্মিনালটি পরিচালনা করে আসছিল। গত বছরের ৬ জুলাই তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক এর পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

এই প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে এবং বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

নৌপরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই চুক্তি ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।’

সরকারের ভাষ্য, এই চুক্তির ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড ও কনটেইনার ডুয়েল টাইম কমবে এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের লজিস্টিকস ব্যয় সাশ্রয় হবে। ফলে বিশেষ করে পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো খাতগুলো উপকৃত হবে।

আন্দোলনের মধ্যে চুক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাকারিয়া বলেন, সরকার আশা করছে, এই চুক্তির ফলে বন্দর ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দ্য ডেইলি স্টার চুক্তির সারসংক্ষেপে দেখেছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমানে কর্মরত কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করা হবে না; তাদের নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় কোনো পরিবর্তন হবে না।

সরকার আরও আশা করছে, স্থানীয় কর্মীরা আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ পাবেন। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

চুক্তিটি সরকার থেকে সরকার ব্যবস্থার আওতায় করা হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড সম্পূর্ণভাবে দুবাই সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এই চুক্তির লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক ছিল।

এটি ল্যান্ডলর্ড-পোর্ট মডেল অনুসরণ করবে। এনসিটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) হাতে, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বে থাকবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে টার্মিনাল পরিচালনা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসহ সিপিএর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির ব্যয় ২০৫ মিলিয়ন ডলার ধরা হলেও চুক্তিতে কনসেশন মেয়াদে অপারেটরের প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতির উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, প্রতি টিইইউতে টার্মিনালের গড় আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিপিএ ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ রাজস্ব পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এবং আড়াই হাজার কোটি টাকা নিট আয় করেছে।

চুক্তির সারসংক্ষেপে কার্যসম্পাদনের সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধীরে ধীরে ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনা, দ্বিতীয় বছর থেকে ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও অটোমেশনের মাধ্যমে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালু করা।

এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া ২০১৯ সালে শুরু হয়।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক একটি বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত করে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বেছে নেয়। তবে তীব্র বিরোধিতা ও চলতি বছরের শুরুর দিকে শ্রমিকদের ধর্মঘটের মুখে প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার নতুন করে আবারও আলোচনা শুরু করে।

Related Articles

Latest Posts