গোল মেসির, ইতিহাস মেসির, মুহূর্তটি আলমাদার

গোলপোস্টের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন থিয়াগো আলমাদা। সামনে ছিল সোনালি এক সুযোগ। স্টেডিয়ামের হাজারো চোখ তখন তার দিকে। সাধারণ ফুটবলারের প্রবৃত্তি বলে, এমন মুহূর্তে শট নিতে হয়। বল জালে পাঠাতে হয়। নিজের নামকে আলোয় লিখতে হয়। কিন্তু আলমাদা বেছে নিলেন আরও উজ্জ্বল আলোকে।

একটি ক্ষণিকের সিদ্ধান্ত। এক সেকেন্ডেরও কম সময়। অথচ সেই সিদ্ধান্তই পরে হয়ে গেল ইতিহাসের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি।

ফাকুন্দো মেদিনার কাটব্যাক ডি-বক্সে পৌঁছাতেই মনে হয়েছিল, এবার হয়তো আলমাদার শট আসছে। অস্ট্রিয়ার রক্ষণও সেটাই ভেবেছিল। গোলরক্ষকও প্রস্তুত ছিলেন সেই সম্ভাবনার জন্য। কিন্তু আলমাদা বল ছুঁলেনই না। দুই পা ফাঁক করে, শরীর সামান্য সরিয়ে, বলটিকে যেতে দিলেন নিজের পেছনে।

আর ঠিক তখনই আবির্ভাব লিওনেল মেসির। যেন তিনি আগেই জানতেন বলটি তার জন্যই আসছে। বাঁ পায়ের চিরচেনা সেই শট। না খুব জোরে, না খুব উঁচুতে। কিন্তু এতটাই নিখুঁত যে বল জালে জড়ানোর আগেই গ্যালারির মানুষ বুঝে গিয়েছিল কী হতে যাচ্ছে।

গোল। শুধু গোল নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ডও জন্ম নিল সেই শটে।

কিন্তু গোলের উচ্ছ্বাস থেমে যাওয়ার পরও একটি প্রশ্ন বাতাসে ভাসে, আলমাদা কীভাবে জানলেন, তার পেছনে মেসি আছেন?

কারণ ডামিটি করার মুহূর্তে তিনি একবারও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাননি। বল আসার আগেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চারপাশ দেখে নিয়েছিলেন। পেশাদার ফুটবলের সবচেয়ে সূক্ষ্ম গুণগুলোর একটি হলো এই ক্ষমতা, মাথা তুলে এক ঝলকে পুরো দৃশ্যটি দেখে নেওয়া, কে কোথায় আছে তা মনে গেঁথে রাখা, তারপর বল পায়ে আসার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা।

সম্ভবত আলমাদাও সেটিই করেছিলেন। তিনি জানতেন আক্রমণের গতিপথ কোন দিকে এগোচ্ছে। জানতেন, পেছনের ফাঁকা জায়গাটিতে উঠে এসেছেন মেসি। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি জানতেন সেই জায়গায় যদি বল পৌঁছে যায়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাঁ পাগুলোর একটি সেটির অপেক্ষায় আছে।

ফুটবলের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্পেশাল অ্যাওয়ারনেস’। মাঠকে চোখে নয়, মস্তিষ্কে দেখে ফেলার ক্ষমতা। আলমাদার ডামিটি তাই কেবল একটি কৌশলী সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল কয়েক সেকেন্ড আগে দেখা একটি দৃশ্যের ওপর অটল বিশ্বাস। তিনি বলটিকে ছেড়ে দিয়েছিলেন কারণ তিনি আন্দাজ করেননি, তিনি জানতেন।

আর সেই জানাটাই মুহূর্তটিকে আরও অসাধারণ করে তোলে।

অনেক সময় ইতিহাসের পাতায় গোলদাতার নামই সবচেয়ে বড় অক্ষরে লেখা থাকে। কিন্তু সেই গোলের পেছনে যে অদৃশ্য শিল্পী কাজ করেন, তিনি থেকে যান আড়ালে। আলমাদার ডামি ছিল ঠিক তেমনই এক শিল্পকর্ম, যার সৌন্দর্য বোঝার জন্য গোলের চেয়েও গভীরে তাকাতে হয়।

ফুটবলে ডামি আসলে এক ধরনের প্রতারণা। তবে তা প্রতিপক্ষকে ঠকানোর শিল্প। এমন এক কৌশল, যেখানে খেলোয়াড় বল স্পর্শ না করেও ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন। বলের সঙ্গে নয়, খেলেন প্রতিপক্ষের চিন্তার সঙ্গে। তাদের অনুমানের সঙ্গে। তাদের চোখের সঙ্গে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত নতুন নয়। পেলের কথা মনে পড়ে। ১৯৭০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে বল স্পর্শ না করেই গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করেছিলেন তিনি। যদিও গোলটি হয়নি, তবু সেই ডামি আজও ফুটবলের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেনিস বার্গক্যাম্পের কিছু ডামি ছিল যেন দাবাড়ুর চাল। আবার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জিনেদিন জিদান কিংবা রোনালদিনিয়োরাও বহুবার দেখিয়েছেন, বল না ছুঁয়েও কীভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কিন্তু আলমাদার ডামির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়।

এটি শুধু একটি সুন্দর কৌশল ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া। অ্যাসিস্টটি হয়তো মেদিনার নামের পাশে থাকবে, কিন্তু ফুটবল মনে রাখবে আলমাদাকে। 
 

Related Articles

Latest Posts