খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি ছাড়াল, বারবার ছাড় দেওয়ায় ব্যাংকে ফিরছে না টাকা

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের একের পর এক নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলেও বদলায়নি পরিস্থিতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

জুন পর্যন্ত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছিল, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে। এর কারণ, ক্ষমতাচ্যুত সরকার-সংশ্লিষ্ট এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে যায়।

ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, ৬ মাস আগে যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল নীতি, এককালীন এক্সিট নীতি এবং আরও কয়েকটি নীতিগত সহায়তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অনেক ঋণগ্রহীতা প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার সামর্থ্যও রাখেন না। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল নীতি বাস্তবায়ন করতে পারছে না।

তিনি বলেন, কিছু ঋণগ্রহীতা আরও সময় চাচ্ছেন। ফলে পুনঃতফসিলের অনেক আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন।

এদিকে ঋণের সুদ জমছে এবং এই সুদ খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, বলেন তিনি।

ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে সরকার সংকটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করেছে।

এক্সিম ব্যাংক ছাড়া অন্য চারটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের প্রভাব ছিল। এই পাঁচটি ব্যাংককে এখন একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের জন্য মূলত বিগত সরকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতা দায়ী। তাদের অনেকেই এখন আর ব্যবসায় নেই। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতা ভেদে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ৫ টাকার কোনো ঋণ সুদসহ বেড়ে ১৫ টাকা ও মেয়াদোত্তীর্ণ হলে, ব্যাংক পুরো ১৫ টাকা দাবি না করে ৮ টাকায় নিষ্পত্তির কথা বিবেচনা করতে পারে।

সুদ মওকুফের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের কিছুটা পরিশোধের সময় না দিলে ‘ওয়ান-টাইন এক্সিট’ নীতিতে খুব বেশি সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ অনেকের পক্ষেই একসঙ্গে পুরো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

‘ঋণগ্রহীতার ধরন অনুযায়ী আমরা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করি—কিছু ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ করি, অন্য ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিই এবং প্রয়োজন হলে ঋণ আদায়ের জন্য সম্পদ বিক্রি করি,’ বলেন ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান।

তার মতে, ঋণ আদায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান ও সুশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকারদের সক্রিয়, বাস্তবভিত্তিক ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এমন বাস্তবসম্মত ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার ওপর জোর দিতে হবে, যা ঋণ আদায় বাড়াবে, প্রতিষ্ঠানের মূল্য ধরে রাখবে এবং সব অংশীজনের স্বার্থ সুরক্ষিত করবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, একই ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ায় বাজারে ভুল বার্তা গেছে। ফলে ঋণগ্রহীতারা প্রত্যাশা করছেন বারবার সময় বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট না দিয়ে তারা পার পেয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে ওয়ান-টাইম এক্সিট সুবিধা ও ঋণ অবলোপনসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে বারবার ছাড় দেওয়ায় ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।

খেলাপি ঋণ প্রায় ৩২ শতাংশে পৌঁছানোর পর নিয়ন্ত্রক ছাড় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

‘কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে বারবার নিয়ন্ত্রক ছাড় দেওয়া হবে না। না হলে এটি আর্থিক খাতে পদ্ধতিগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে তা দুর্বল করে দিতে পারে,’ বলেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts