কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই যেভাবে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন ভাইকিংরা

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাহামায় পৌঁছান। কিন্তু তার প্রায় ৫০০ বছর আগেই উত্তর আমেরিকায় গিয়েছিলেন ইউরোপের একদল নাবিক। নর্স জনগোষ্ঠীর এই নাবিকেরা ভাইকিং নামে পরিচিত।

আধুনিক কানাডার উপকূলে ভাইকিংদের বসতি স্থাপনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে তাদের অভিযানের ইতিহাস দীর্ঘদিন মানুষের অজানাই ছিল।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলম্বাসের অভিযানের মতো ভাইকিংদের আগমন ঘিরে কোনো রাজকীয় ঘোষণা হয়নি, তাদের স্বাগত জানাতে রাস্তায় মানুষের ভিড়ও জমেনি। এর একটি কারণ, তারা সরাসরি ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাননি। বরং আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে যাত্রাবিরতির ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ধাপে ধাপে এগিয়েছিলেন।

ভাইকিংদের এসব অভিযানের কথা জানা যায় নর্স সাগা থেকে। সাগা হলো নর্স জনগোষ্ঠীর অতীতের ঘটনা, অভিযান ও মানুষের জীবন নিয়ে লেখা কাহিনি। কয়েক শতাব্দী পর তাদের বংশধরেরা এসব কাহিনি লিখে রাখেন।

দীর্ঘদিন সেগুলোকে মহাকাব্যিক গল্প বা কিংবদন্তি হিসেবে দেখা হলেও পাণ্ডুলিপি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এখন এসব কাহিনির ঐতিহাসিক ভিত্তিও সামনে এসেছে।

নর্সদের অভিযানের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হলো ‘ফ্ল্যাটেইয়ারবোক’ বা ‘ফ্ল্যাটে দ্বীপের বই’। ১৯৬৬ সালে বিবিসির উপস্থাপক ম্যাগনাস ম্যাগনুসন ১৪ শতকে লেখা এই বইকে আইসল্যান্ডের অন্যতম মূল্যবান পাণ্ডুলিপি হিসেবে বর্ণনা করেন।

বইটির গুরুত্ব বোঝা যায় ১৮৯৩ সালের একটি ঘটনা থেকে। সে বছর শিকাগো বিশ্বমেলার আয়োজকেরা কলম্বাসের অভিযানের ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পাণ্ডুলিপিটি ধার চেয়েছিলেন। তখন বইটি ডেনমার্কে সংরক্ষিত ছিল।

ম্যাগনুসনের ভাষ্য, আয়োজকেরা বইটি আনতে ডেনমার্কে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে সাঁজোয়া ট্রেনে পরিবহন এবং ১০ লাখ ডলারের বিমা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারপরও ডেনমার্ক কর্তৃপক্ষ পাণ্ডুলিপিটি পাঠানোর ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি।

কেন বইটি নিয়ে এত আগ্রহ ছিল? কারণ, এতে দশম শতকে গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের বসতি স্থাপন এবং কয়েক বছর পর উত্তর আমেরিকা আবিষ্কার ও সেখানে বসতি গড়ার চেষ্টার বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ, কলম্বাসের অভিযানের প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগেই উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন এই নাবিকেরা।

পাণ্ডুলিপিতে লেখা কাহিনির ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজতে গবেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি পাওয়া যায় কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে।

১৯৬০ সালে সেখানকার ল’আন্স ও মেদোজে এলাকায় নর্সদের একটি অস্থায়ী শিবিরের সন্ধান পান গবেষকেরা। পরে ২০২১ সালে নতুন পদ্ধতিতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বয়স নির্ধারণ করে তারা জানান, ভাইকিংরা প্রায় এক হাজার বছর আগে সেখানে অবস্থান করেছিলেন।

গবেষকদের ধারণা, জায়গাটি ছিল নর্সদের একটি ঘাঁটি। সেখান থেকে তারা উত্তর আমেরিকার আরও ভেতরের অঞ্চল অনুসন্ধান করতেন। ফলে এই আবিষ্কার শুধু তাদের সেখানে পৌঁছানোর প্রমাণ নয়, বরং আরও বিস্তৃত অভিযানের সম্ভাবনাও তুলে ধরে।

বিবিসির তথ্যচিত্র টাইমওয়াচ-এর ১৯৯৭ সালের একটি পর্বে রবিন এলিস বলেছিলেন, ‘এটি এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের শুরু। এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন ইউরোপীয়রা আমেরিকায় যেতেন, কিন্তু তাদের সেই যাত্রার বিবরণ কেবল সমুদ্রেই লেখা থাকত।’

ভাইকিংদের এই অভিযানের পথ তৈরি হয়েছিল কয়েক ধাপে। প্রায় ৮৭০ সালের দিকে নর্সরা আইসল্যান্ডে পৌঁছান। এর প্রায় ১০০ বছর পর তারা গ্রিনল্যান্ডে যান। সেখান থেকে আরও পশ্চিমে আধুনিক কানাডার উপকূলে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

গ্রিনল্যান্ড থেকে কানাডার বাফিন দ্বীপে যেতে ডেভিস প্রণালি পাড়ি দিতে হতো। এই দূরত্ব প্রায় ২০০ মাইল। নর্সরা বাফিন দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন ‘হেলুল্যান্ড’, যার অর্থ পাথরের চাঁইয়ের দেশ।

এরপর উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে তারা পৌঁছান ল্যাব্রাডরে। এর নাম দিয়েছিলেন ‘মার্কল্যান্ড’, অর্থাৎ বনের দেশ। আরও দক্ষিণে একটি ভূখণ্ডকে তারা নাম দেন ‘ভিনল্যান্ড’, যার অর্থ আঙুরলতার দেশ।

এসব নাম ও যাত্রার বিবরণ পাওয়া যায় নর্স সাগায়। তবে ভাইকিংরা শুধু একটি জায়গায় পৌঁছে ফিরে এসেছিলেন, এমন নয়। বিবিসির টাইমওয়াচ-এর ২০১৬ সালের একটি পর্বে আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমিলি লেথব্রিজ বলেন, সাগায় একাধিক স্থানে যাওয়ার কথা রয়েছে। নর্সরা কয়েক বছর ধরে এসব অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন। তাদের সামনে ছিল অনুসন্ধানের এক নতুন পৃথিবী।

উত্তর আটলান্টিকে নর্সদের বিস্তারের ইতিহাসে এরিক দ্য রেড গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। নর্স সাগা অনুযায়ী, নিজের বাবাকে হত্যার দায়ে নরওয়ে থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর এরিক প্রায় ৯৬০ সালের দিকে আইসল্যান্ডে আসেন।

তখন আইসল্যান্ডে ‘আলথিং’ নামে একটি সংসদীয় ব্যবস্থা ছিল। ৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রতি গ্রীষ্মে দুই সপ্তাহ ধরে আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যক্রম চলত। অধিবেশন বসত একটি প্রাকৃতিক উপত্যকায়, যেখানে উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থল রয়েছে।

আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমিলি লেথব্রিজ বিবিসিকে বলেন, জায়গাটির বিশেষত্ব শুধু এর শব্দ প্রতিধ্বনির কারণে নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক ফাটল, যেখানে উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাত মিলেছে।

আলথিংয়ে সমাজের নিয়ম ভঙ্গকারীদের নির্বাসনের শাস্তি দেওয়া হতো। নির্বাসিত ব্যক্তিরা অন্য কোথাও যেতে পারতেন, কিন্তু শাস্তির মেয়াদে আইসল্যান্ডে ফিরতে পারতেন না। ৯৮২ সালে প্রতিবেশী এক কৃষকের সঙ্গে সহিংস বিরোধের জেরে এরিক দ্য রেডকে সেখান থেকেও নির্বাসিত করা হয়।

এই নির্বাসনই তাকে নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। লেথব্রিজের ভাষ্য, এরিকই প্রথম আইসল্যান্ডবাসী, যিনি গ্রিনল্যান্ড আবিষ্কার করেন এবং সেখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। সেই বসতি প্রায় ৫০০ বছর টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকা নর্সদের অভিযানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

লেথব্রিজ বলেন, ‘তারা ছিলেন এমন মানুষ, যারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। নতুন কী পাওয়া যায়, তা দেখতে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে খোলা নৌকায় যাত্রা করার মতো কঠিন শারীরিক পরীক্ষার মধ্য দিয়েও যেতে রাজি ছিলেন।’

এরিক দ্য রেডের ছেলে লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে নর্সরা গ্রিনল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকায় একাধিকবার গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। গ্রিনল্যান্ডে তাদের বসতি ১৫ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত টিকে ছিল।

অনেকের ধারণা, লেইফ এরিকসন ও তার সঙ্গীরা ভিনল্যান্ডে গিয়ে ফিরে আসার পর উত্তর আমেরিকায় নর্সদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এ ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

কানাডার মিউজিয়াম অব সিভিলাইজেশনের প্রত্নতত্ত্ববিদ রবার্ট ম্যাকগি বিবিসির টাইমওয়াচ-এ বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, পরবর্তী দুই থেকে তিন শতকেও নর্সরা মাঝেমধ্যে উত্তর আমেরিকায় যাতায়াত করতেন।

অর্থাৎ, ভাইকিংদের অভিযান কেবল একটি যাত্রায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের যাতায়াত ও অনুসন্ধান চলেছিল বলে মনে করেন গবেষকেরা।

ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকা যাত্রার কয়েক শতাব্দী পর কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বাহামায় পৌঁছান। কিন্তু তার আগে ইউরোপীয় নাবিকদের উত্তর আমেরিকায় যাতায়াতের ইতিহাস ছিল। প্রশ্ন হলো, কলম্বাস কি সেই ইতিহাস সম্পর্কে জানতেন?

মধ্যযুগের নৌযাত্রা বিষয়ক গবেষক কির্স্টেন সিভার বিবিসির টাইমওয়াচ-এ বলেন, মধ্যযুগজুড়েই গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকার উপকূলে যাতায়াতের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

সিভারের মতে, ১৪৮০ সালের দিকে নাবিকেরা সরাসরি উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তারা তখন ‘আইল অব ব্রাজিল’ নামে একটি ভূখণ্ডের কথা জানতেন। তার ধারণা, এটি তাদের প্রথম যাত্রা ছিল না; বরং গ্রিনল্যান্ড হয়ে না গিয়ে সরাসরি উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর প্রথম চেষ্টা হতে পারে।

কলম্বাসের সঙ্গে এ বিষয়ে তথ্যের যোগসূত্রও রয়েছে। সিভারের উল্লেখ করা একটি নথি অনুযায়ী, ১৪৯৭-৯৮ সালের শীতে জন ডে নামের এক ইংরেজ ব্যক্তি কলম্বাসকে চিঠি লিখে জন ক্যাবটের ১৪৯৭ সালের উত্তর আমেরিকা অভিযানের কথা জানান।

চিঠিতে ডে উল্লেখ করেন, কলম্বাস নিজেও জানতেন যে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের নাবিকেরা বহু বছর ধরে উত্তরের ওই অঞ্চলে যাতায়াত করছেন। এ থেকে ধারণা করা হয়, কলম্বাসের কাছে উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগের অভিযানের খবর পৌঁছে থাকতে পারে। তবে তিনি ঠিক কতটা জানতেন, তা নিশ্চিত নয়।

কলম্বাসের যাত্রাপথ নিয়েও একটি তত্ত্ব রয়েছে। রবার্ট ম্যাকগির মতে, উত্তর গোলার্ধে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় উত্তরের অক্ষাংশ দিয়ে গেলে আটলান্টিকের দূরত্ব তুলনামূলক কম হতে পারে। এরপর দক্ষিণে নেমে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।

কিন্তু কলম্বাস সরাসরি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলেন। ম্যাকগির ধারণা, তিনি হয়তো কানাডা বা ভাইকিংদের পরিচিত ভিনল্যান্ড এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কারণ, তার মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকা নয়, বরং এশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের সম্পদে পৌঁছানো।

ম্যাকগির ভাষ্য, কলম্বাস হয়তো এমন একটি ভূখণ্ড এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যা তার গন্তব্য ছিল না। তবে এটি একটি তত্ত্ব, নিশ্চিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নয়।

প্রতি বছর অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে কলম্বাস দিবস পালন করা হয়। তবে আমেরিকায় ইউরোপীয়দের পৌঁছানোর ইতিহাস শুধু কলম্বাসের ১৪৯২ সালের অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়।

আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘাঁটি করে ভাইকিংদের উত্তর আমেরিকা যাত্রা, কানাডায় তাদের বসতির প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং নর্স সাগায় সংরক্ষিত কাহিনি সেই ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় তুলে ধরে। কলম্বাসের প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া এসব নাবিক নতুন ভূখণ্ড অনুসন্ধানে ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

তাদের অভিযানের সব বিবরণ আজও জানা যায়নি। তবে পাণ্ডুলিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাসের নানা দিক সামনে আসছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগমনের ইতিহাস বুঝতে হলে কলম্বাসের আগের এই অভিযাত্রীদের কথাও মনে রাখতে হবে।

Related Articles

Latest Posts